মঈনুল হক চৌধুরী
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদক
ঢাকা, ফেব্র"য়ারি ২০ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- বন্যপ্রাণীর আক্রমণে কারো মৃত্যু হলে দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে সরকার।
এ সংক্রান্ত প্রস্তাবিত...
চিত্রা হরিণ বাংলাদেশের স্থলজ স্তণ্যপায়ীর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও নিরীহ। একসময় বাংলাদেশের অধিকাংশ গভীর বনে এর দেখা পাওয়া গেলেও এখন এর শেষ আশ্রয়স্থল সুন্দরবনসহ দু’চারটি বনে। আমাদের দেশে হরিণের বিপুল সম্ভবনা থাকলেও এদের নিয়ে গবেষণা তেমন হয়নি। দিন দিন হরিণের আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে এদের টিকে থাকাই এখন দায়। বন্যপ্রাণী গবেষক ড: মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজের মতে আমাদের এখনও যেসব বন আছে সেখানে সুষ্ঠু মনিটরিংয়ের মাধ্যমে হরিণের প্রজনন বৃদ্ধি করা সম্ভব। এর জন্য হরিণ ফার্মিংয়ের মডেল হিসেবে আমরা নিঝুম দ্বীপ বা উপকূলীয় অন্য কোন বন ব্যবহার করতে পারি। তাতে হরিণের খাদ্যভাস, প্রজনন হার, প্রিডেটর সমস্যা, রোগব্যাধিসহ যাবতীয় তথ্য সহজেই সংগ্রহ করা যাবে যা বন্যপ্রাণী গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত সৃষ্টি হতে পারে। এভাবেই চিত্রা হরিণকে দেশের অন্যান্য বনে ফিরিয়ে দেয়া যেতে পারে। তাতে একদিকে যেমন হরিণের বর্তমান সংকট দূর হবে অন্যদিকে বিদেশে হরিণ রপ্তানির মাধ্যমে উপার্জনও সম্ভব।
বাংলাদেশে হরিণ প্রজাতি
বাংলাদেশে মোট ৫ প্রজাতির হরিণের রেকর্ড আছে। এদের মধ্যে দুই প্রজাতির হরিণ (হগ ডিয়ার ও সোয়াম্প ডিয়ার) বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাকী তিন প্রজাতির মধ্যে প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে বারকিং ডিয়ার ও সাম্বার ডিয়ার। এদের এখন সিলেটের গভীর বন ও কাপ্তাই, পার্বত্য চট্টগ্রাম, এবং বান্দারবন এলাকায় কালেভদ্রে পাওয়া যায়। স্পটেড ডিয়ার বা চিত্র হরিণ এদেশে অন্যান্য হরিণের চেয়ে এখনও বেশ ভাল আছে। শুধু সুন্দরবনেই বন বিভাগের তথ্যমতে চিত্রা হরিণের সংখ্যা ৫০-৮০ হাজার। চট্টগ্রাম পাহাড়ী এলাকা, মধুপুর বন ও সিলেটের গভীর বনে হাতে গোনা কিছু চিত্রা হরিণ থাকতে পারে। সর্বশেষ সরকার হরিণ সংকট মোকাবেলায় নিঝুম দ্বীপে হরিণ ছাড়ে। এ বনে হরিণের খাবার সংকট ও প্রিডেটর সমস্যা না থাকায় মাত্র এক যুগেই হরিণ বেড়ে প্রায় বিশ হাজার। যথাযথ গবেষণা ও পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে বর্তমানে হরিণ এখানেও একধরণের সংকটে চলছে।
নিঝুম দ্বীপ ও হরিণের সংকট
নিঝুম দ্বীপ একেবারেই প্রাকৃতিক বন না হলেও বন্যপ্রাণী বসবাস উপযোগী করে তোলা মানবসৃষ্ট বন আমাদের দেশে আর নেই বললেই চলে। ১৯৭৩ সালে সরকার এখানে বনায়ন শুরু করে। রোপনকৃত গাছের মধ্যে ৭০ভাগ কেওড়া, ১০ ভাগ গেওয়া আর বাকী ২০ভাগ হল বাইন ও কাকড়া। মাত্র সাত-আট বছরের বনায়ন কার্যক্রমের ফলে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে গভীর বাদাবনের এক অন্যরকম মডেল তৈরী হয়। এরপর ১৯৭৪-১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এখানে ৭টি ছেলে ও ৭টি মেয়ে হরিণ ছাড়া হয়। পর্যাপ্ত খাবার ও প্রিডেটর সমস্যা না থাকায় মাত্র এক যুগেই হরিণের বংশ বৃদ্ধি হয়ে প্রায় বিশ হাজারে দাঁড়ায়। অন্যান্য এলাকার চেয়ে নিঝুম দ্বীপের হরিণ বেশ স্বাস্থ্যবান ও বড়। তারপর গাছগুগুলো মাটির উর্বতা ও স্বাভাবিক পরিবেশের কারণে দ্রুত বৃদ্ধি লাভ করে। অন্যদিকে বনের কারণে এখনে দ্রুত গড়ে উঠে বৈধ-অবৈধ পর্যটন ব্যবসা ও বিশাল জনগোষ্ঠী। ফলে বনের উপর মানুষের চাপ দিন দিন বাড়তে থাকে। বনের চারপাশে যে বিশাল গ্রাসল্যান্ড আছে তাতে সবসময়ই মহিষ চরে বেড়ায়। ফলে সকাল ও বিকালে হরিণ মাঠে নেমে খাবার খেতে পারে না। এসব কারণে নিরবেই হরিণের খাদ্যসংকট লেগে থাকলেও আমরা কেউই খেয়াল করিনি। নিঝুম দ্বীপে বনায়ন ও হরিণ ছাড়া হলেও এখানে মিঠা পানির জন্য পুকুর খোঁড়া হয়নি। তবে এবছর চারটি পুকুর খোঁড়া হলেও তা হরিণের জন্য কতটা উপযোগী তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলেই প্রশ্ন্ উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে বনের মধ্যে মশা অনেক বেড়ে যায়। এছাড়া এসময় স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশের কারণে খুড়া রোগসহ বিভিন্ন ধরণের রোগ সহজেই বিস্তার লাভের সুযোগ পায়। প্রতি বছরই বিভিন্ন রোগে বহু হরিণ মারা পড়লেও এ নিয়ে কারও মাথা ব্যাথা নেই। আস্তে আস্তে হরিণগুলো তাদের বেঁচে থাকার তাগিদে নদী পেরিয়ে পাশের চরগুলোতে যাবার চেষ্টা করে। এভাবেও কিছু হরিণ মারা পরে। বর্তমান সময়ে হরিণের শত্রু হিসেবে কুকুরকে দায়ী করা হচ্ছে। চার-পাঁচটি কুকুর মিলে দীর্ঘক্ষণ ধরে একটি হরিণকে তারা করছে এবং হরিণ ধরে খাচ্ছে। গাছের ঘনত্ব বেশী হওয়ায় পুরুষ শিংওয়ালা হরিণগুলো দ্রুত দৌড়াতে দিয়ে গাছের সাথে শিং আটকে যায়। আর তখনই কুকুর হরিণকে ধরে ফেলে। এ কারণে কুকুর পুরুষ হরিণকেই বেশী ধরে। তবে বনের মধ্যে হরিণের যত কঙ্কাল পাওয়া যায় তার মথ্যে মেয়ে হরিণের মাথার সংখ্যা বেশী। কারণ পুরুষ হরিণের শিং পর্যটকদের কাছে বিক্রির জন্য মানুষ নিয়ে যায়। খুলি গুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে এখানে বাচ্চা হরিণেরও মৃত্যুহার বেশ। হরিণের বাচ্চাগুলোকে শিয়াল ধরে খাওয়ার এক নমুনা হাড় ও মাথার খুলি পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে। কুকুর বা শিয়াল যদি হরিণ ধরে খায় তাতে দোষের কিছু নেই। এক ধরণের প্রিডেটরের জন্ম নিলে হরিণের ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স আসবে। নিঝুম দ্বীপের মত একটি বনে পাঁচ হাজার হরিণই যথেষ্ট। এখন প্রশ্ন হল সরকার নিঝুম দ্বীপের হরিণ নিয়ে কি ভাবছে তা কিন্তু স্পষ্ট নয়। এখানে কি হরিণের প্রজনন সংখ্যা বাড়িয়ে অন্য বনে ছেড়ে দেয়া হবে,পর্যটন স্পষ্ট করা হবে, গবেষণা কেন্দ্র করা হবে, না শুধুই হরিণ ছাড়া দরকার তাই ছাড়া হয়েছে? যদি এগুলোর কোন একটির দিকে নজর দেয়া হত তাহলে বিশেষজ্ঞ মহল নিয়ে কেন এত দিন কাজ শুরু করা হয়নি? নিঝুম দ্বীপের বনের যে গঠন তাতে হরিণের বিপুল সম্ভাবনার দিকটি কখনই ফেলে দেয়া যায় না। সামান্য প্রচেষ্টায় এখানে ইকোট্যুরিজমের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ব্যতিক্রমী পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়। এখান থেকেই হরিণ ফার্মিংয়ের স্বপ্ন আমরা শুরু করতে পারি।
হরিণ ফার্মিং ও সম্ভবনা
হরিণ ফার্মিংয়ের সম্ভবনা অকল্পনীয় কোন ঘটনা নয়। ছাগল বা ভেড়া ফার্মিং করা গেলে হরিণ ফার্মিংও সম্ভব। আমাদের বিস্তীর্ন উপকূলীয় এলাকায় (নোয়াখালী, ভোলা, পটুয়াখালি, বরিশাল) বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে চরাঞ্চল। এসব চরাঞ্চল এখন ছোটবড় বহু ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে। এ বনগুলো শুধু মানুষ দখল আর ধ্বংসই করছে। কোন বনেই বন্যপ্রাণীরা নিরাপদ নয়। সরকারী বা কোন সংগঠন থেকে কোন গবেষণাও হয়নি। অথচ এই খন্ড খন্ড বনভূমিকে আমরা সহজেই কাজে লাগাতে পারি। সরকারী উদ্যেগেই এসব বনে হরিণ ফার্মিং শুরু করা যেতে পারে। এর জন্য খুব বেশী জনবলের বা ইনভেস্টমেন্টের দরকার পড়ে না। প্রতিটি বনে হরিণ ফার্মিং শুরু হলে বনগুলো ধ্বংস না হয়ে আরও পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠবে। চিত্রা হরিণের চাহিদা বিদেশে অনেক। শুধুমাত্র ভারত, নেপাল, এবং শ্রীলঙ্কার বনে দেখা গেলেও ইদানিং রপ্তানি করা হচ্ছে আর্জেটিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, আমেরিকাসহ অনেক দেশে।
উন্নত দেশে হরিণ ফার্মিং বহু আগে থেকেই শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের চিত্রা হরিণ এত জনপ্রিয় হওয়া স্বত্ত্বেও এ নিয়ে আমরা ভাবা শুরু করিনি। এ অবস্থা চলতে থাকলে অন্যতম সম্ভাবনাময় একটি প্রজাতি থেকে সুফল লাভ করতে আমরা ব্যর্থ হবো।
হরিণ বিষয়ক লেখার জন্য
হরিণ বিষয়ক লেখার জন্য ধন্যবাদ। এখনো পড়িনি, একটু সময় নিয়ে পড়ব । হরিণের এই সুন্দর ছবিটি কি আপনারই তোলা?
ছবিটি উইকি থেকে নেয়া।
ছবিটি উইকি থেকে নেয়া। রেফারেন্স দেয়া আছে। ধন্যবাদ।
Thanks for the articals.
Thanks for the articals.
মন্তব্য করুন