কুমির মানেই মানুষের কাছে একটি ভয়ঙ্কর প্রাণীর নাম। এরা গৃহপালিত পশু, মানুষ এমনকি ডিঙি নৌকা পর্যন্ত নাকি আক্রমণ করে। বাস্তবে কুমির স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষকে বা অন্য কাউকে আক্রমণ করার নজির খুবই কম। শুধুমাত্র এই ভুল ধারণাটিই কুমির হারিয়ে যাবার অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে কুমিরের তিনটি জাত আছে। এর মধ্যে মিঠা পানির কুমির বিলুপ্ত হয়েছে বহু আগেই। এখন পাওয়া যায় শুধুমাত্র খান জাহান আলীর মাজার,ডুলাহাজরা সাফারী পার্ক ও চিড়িয়াখানায়। লোনা পানির কুমির আছে সুন্দরবন এলাকায়। এর অবস্থাও বেশ খারাপ। সুন্দরবন এলাকার আশেপাশে যেসব জেলেরা মাছ ধরতে যায় তারা যেকোন দুর্ঘটনায় মারা পড়লেই বা হারিয়ে গেলেই কুমিরে ধরে নিয়ে গেছে বলে গুজব ছড়ানো হয়। কোন রকম গবেষনা ছাড়া এ ধরণের অপবাদ দেয়া সত্যিই অন্যায়। দিন দিন মানুষের অত্যাচার, ডিম পাড়া ও বাচ্চা ফুটানোর পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে লোনা পানির কুমির প্রায় বিপন্ন হবার পথে। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের আঁচ। পানিতে লবণের পরিমান দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। এই অবস্থা কুমিরের টিকে থাকার জন্য বেশ হুমকি। তবে সুখের কথা হল এরই মধ্যে এই লোনা পানির কুমিরের ক্যাপটিভ প্রজনন শুরু হয়েছে। বাকী থাকে শুধু ঘড়িয়াল। দেশী-বিদেশী অনেক গবেষকরা জোড় দিয়েই বলছেন ঘড়িয়াল এ দেশ থেকে হারিয়ে গেছে। কোন তথ্যের উপর ভিত্তি করে তারা আওয়াজ তুলছেন তার প্রমাণ কিন্তু তারা দিতে পারেননি। একটু বলে রাখি এই বছরই এদেশের পদ্মা যমুনায় মোট ছয়টি ঘড়িয়ালের বাচ্চা ও একটি মা ঘড়িয়ালের সন্ধান পাওয়া গেছে। কাজেই ঘড়িয়াল যে আমাদের দেশে এখনও টিকে আছে তা বলার অবকাশ রাখেনা।
নদীর প্রাণ ঘড়িয়াল:
ঘড়িয়াল এদেশের তথা গোটা উত্তর বঙ্গের খুবই ঐতিহ্যবাহী একটি প্রাণী। মূলত পদ্মা যমুনাতেই এর বড় আস্থানা। নদীর প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকারের প্রাণীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ ফিট আর ওজন প্রায় ১৫০ কেজির উপর। মেয়ে ঘড়িয়ালের চেয়ে পুরুষটি আরও লম্বা হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও উত্তর ভারত,নেপাল,ভুটান,পাকিস্থানে এদের দেখা মেলতো। তবে এখন পাকিস্থান ও ভুটানে কোন ঘড়িয়াল নেই। ১৯৭০ সালের এক গননায় দেখা গেছে গোটা দুনিয়ায় মাত্র ২০০ ঘড়িয়াল টিকে আছে। ১৯৭৪ সালে তা ৫০-৬০ এসে দাঁড়ায়। ঘড়িয়াল বাঁচানোর জন্য ভারত সরকার বেশ উদ্যেগ গ্রহন করেছে। তারা চাম্বাল, গীতা, সোন, মহানদীসহ বেশ কয়েকটি নদীতে ঘড়িয়াল প্রজননের জন্য সংরক্ষণ এলাকা ঘোষণা করে। এর মধ্যে তার সুফলও পেয়েছে।

ঘড়িয়াল বাঁচাও, নদী বাঁচাও পোস্টার নিয়ে মাঝি।
গোটা দুনিয়ায় এখন যে ক’টি ঘড়িয়াল টিকে আছে তার প্রায় সবই এখন ভারতে। ঘড়িয়াল একটি নদীর প্রাণ। একটি নদীর সুস্থ থাকা অনেকাংশে নির্ভর করে ঘড়িয়ালের টিকে থাকার উপর। আমাদের পদ্মা-যমুনায় এখন মাছের পপুলেশন একবারেই হ্রাস পাওয়ার পেছনে ঘড়িয়াল না থাকা অন্যতম দায়ী। ঘড়িয়াল নদীর জীববৈচিত্র্য তথা ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স রক্ষা করে। এরা কাঁটাযুক্ত বড় মাছ যেমন আইর, বোয়াল, গজার, বাগাড়, পাঙ্গাস সহ অন্যান্য বড় মাছ খায়। ফলে এই রাক্ষুসে মাছগুলোর প্রজনন খুব বেশী বৃদ্ধি পায় না বলে ছোট মাছগুলো সহজেই টিকে থাকতে পারে। এছাড়া ঘড়িয়াল পচা জৈব পদার্থ খেয়ে নদী পরিষ্কার রাখে। ঘড়িয়াল কখনও মানুষ বা গৃহপালিত পশুকে আক্রমণ করে না। তবে প্রজনন কালে অর্থাৎ যেখানে তারা ডিম পারে সেখানে গেলে তারা তাড়া করে। কাজেই নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ টিকে থাকার জন্য ঘড়িয়াল বাঁচানো খুবই জরুরী।
ঘড়িয়াল বাঁচানো স্বপ্ন:
বাংলাদেশে ত্রিশ বছর আগেও পদ্মা, যমুনা ও তাদের শাখা নদীগুলোতে ঘড়িয়ালের বিচরণ ছিল বেশ। নদীর চরগুলোতে ডিম পেরে বাচ্চা ফুটাতো। বর্তমানে ঘড়িয়াল দেখতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ঘড়িয়াল নদীর উপকারী বন্ধু তা বুঝে উঠার আগেই এদেশের মানুষ তাদের প্রায় হারিয়ে ফেলল। এদেশে ঘড়িয়াল নিয়ে গবেষণাও কম হয়েছে। বর্তমানে যে দু’চার ঘড়িয়াল টিকে আছে তা বাঁচাবার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছেন একদল ঘড়িয়াল গবেষক। বাংলাদেশের অন্যতম কুমির গবেষক হলেন ড. এস এম এ রশীদ। তার প্রচেষ্টায় লোনা পানির কুমিরের খামার গঠন করে সাফল্য এসেছে শতভাগ। এখন ঘড়িয়াল বাঁচাবার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছেন সেন্টার ফর এ্যাডভান্স রিসার্চ ইন ন্যাচারাল রির্সোসেস এ্যান্ড মানেজমেন্টের (ক্যারিনাম) হয়ে। মোহাম্মাদ বিন জায়েদ স্পিসিস কনজারভেশন ফান্ডের সহযোগীতায় এরই মধ্যে গোটা পদ্মা ও যমুনায় ঘড়িয়ায় সংরক্ষণে কাজ শুরু করেছে ক্যারিনাম। শীতকালীন শুমারিতে মোট ৭টি ঘড়িয়াল সন্ধান দিয়েছেন তারা। এছাড়া ঘড়িয়ালের জন্য মূল্যবান জায়গাগুলি সনাক্ত করা হয়েছে। এখন সরকার ও স্থানীয় জনগনের সহযোগীতা পেলে গড়ে তোলা হবে ঘড়িয়াল অভয়ারণ্য। বিশাল পদ্মা-যমুনার ছোট ছোট পাঁচ-ছয়টি জায়গা ছেড়ে দিলেই নদীর প্রাণ ঘড়িয়াল বাঁচানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন ক্যারিনাম প্রধান। জায়গাগুলি হল গোদাগারীর হাকিমপুর থেকে আশারিয়াদহ, পবার গোহামবনা থেকে রাজশাহী খানপুর, বগুড়ার সারিয়াকান্দির চন্দনবাইশ্যা, গাইবান্দার লালসামার ও কুড়িগ্রামের তিস্তা নদীর হরিরামপুর চর।
ঘড়িয়াল কেন হারিয়ে যাচ্ছে:
নদীমাতৃক বাংলাদেশ থেকে ঘড়িয়াল হারিয়ে যাবার অন্যতম কারণ হল নদীতে ঘড়িয়ালের খাবার ও ডিম পারার জায়গার পর্যাপ্ত অভাব। প্রায় সব চরের মানুষের বিচরণ হওয়ায় ঘড়িয়াল বাচ্চা ফুটানোর জায়গা পাচ্ছে না। জেলেদের চাপ নদীতে বেড়ে যাবার কারনে ঘড়িয়ালের বাচ্চা ঘন ঘন আটকা পড়ে। আর জালে আটকা পড়া ঘড়িয়ালের বাচ্চা খুব কমই নদীতে ছেড়ে দেয়া হয়। হয় তাদের মেরে ফেলা হয় , না হয় চিড়িয়া খানায় দেয়া হয়। সম্প্রতি ক্যারিনামের গবেষনা থেকে যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে দেখা গেছে প্রায় ৮০ ভাগ আটকে পড়া ঘড়িয়ালের বাচ্চাকেই মেরে ফেলা হয়। আর বাকি ২০ ভাগ চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ বছর যে ৬টি ঘড়িয়ালের বাচ্চা পাওয়া গেছে তার ৪টি চিড়িয়াখানায় নেওয়া হয়। এর মধ্যে পর্যাপ্ত যত্নের অভাবে ঢাকা ও রাজশাহী চিড়িয়াখানার ঘড়িয়াল ছানা গুলো মারা পড়ে। ঘড়িয়াল হরিয়ে যাবার অন্যতম আর একটি কারণ হল ভারতের সাথে আমাদের পানি বন্টন। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে একদম পানি না থাকার কারণে ঘড়িয়ালরা টিকতে পারেনা। জলবায়ুর বিপর্যয়ে উত্তরাঞ্চলে মরুকরণের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এর প্রভাব ঘড়িয়াল টিকে থাকার জন্য হুমকি বলে গবেষকরা বলছেন। ঘড়িয়াল বাঁচানোর জন্য সরকারীভাবে কোন রকম উদ্যোগ গ্রহন করা হয়নি। এমনকি ঢাকা ও রাজশাহী চিড়িয়াখানায় যে ক’টি প্রাপ্ত বয়স্ক ঘড়িয়াল আছে তার ছেলে-মেয়ে অনুপাত পর্যন্ত ঠিক করে রাখা হয়নি।
আমাদের দেশে নদীগুলো এখনও ঘড়িয়াল টিকে থাকার জন্য উপযোগী। ভারতীয়রা বার বার বলে আসছে বাংলাদেশে কোন ঘড়িয়াল নেই। এতে তাদের লাভ হল ঘড়িয়াল নামক প্রাণীটির এখন মালিক শুধু ভারত। আমরা ঘড়িয়ালকে হারাতে দিতে চাইনা। এর জন্য সরকারকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে।
এই মুহূর্তে অন্তত একটি হলেও ঘড়িয়াল অভয়ারণ্য ঘোষণা করা খুবই জরুরী। সাথে সাথে গবেষণার পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।
যত মন্তব্য
বগুড়ার গ্রামাঞ্চলে একে বলে ঘট্যাল কুমির। ঠোঁটের উপরে ঘটির মত একটা অংশ আছে বলে এমন নাম। চমৎকার আর্টিকেল।