ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হতে পারে? সহজ উত্তর...না...তারপরও ব্যতিক্রমই হয়ে ওঠে আমাদের সব আকর্ষনের মূল! মহাপ্রভূর সৃষ্টি মানব সন্তানের কল্পনাকে বার বার আহত করে বলেই তা এতো দুর্নিবার আকর্ষনীয়...
বার্ষিক পরীক্ষা শেষে নানীবাড়ী যাওয়ার আয়োজন চলছে। ঋতূ যথারীতি শীতকাল আর শীতকাল মানেই নানীর হাতের খেঁজুররসের কাঁচিপোঁড়া পিঠে আর বাবার পয়েন্ট টু টু রাইফেল্ দিয়ে শিকার করা পাখির ভূনা মাংস আর নারকেল ভাত। নুতন ক্লাসে ওঠার চেয়ে নানীবাড়ীর সেই পাহাড়ের মতো বিশাল বেলেকুল গাছে উঠতেই বেশি আগ্রহী ছিলাম আমি, ঝাঁপর নামের এক অসম্ভব সুন্দর নদীর পাঁড়ে। শহরের বাথরুমের শাওয়ারের পানিতে সারাবছর গোসল করে নানীবাড়ীর জোনাকী দিঘিতে গা ডোবানোর আমেজই ভিন্ন। আমার নানীবাড়ী মানে সহস্র আনন্দের আঁতুড়ঘর।
যতবার নানীবাড়ী যাই, একটা না একটা আনন্দময় স্মৃতি নিয়ে বাড়ী ফিরি। বন্ধুদের কাছে গল্প করি, কিছু কিছু ঘটনা অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরি, দাম বাড়ানোর জন্যে; কেউ বিশ্বাস করে কেউ করে না, তাতে আমার বয়েই যায়। আমি বরাবর একটু ডানপিটে স্বভাবের, যদি কারো উপর রাগ হয়েছে তো তাকে কামড়ে একেবারে দাঁত বসিয়ে দিই, আর কাউকে ভালো লেগেছে তো মাথায় নিয়ে নাঁচি। কতবার নানীবাড়ি যাই আসি, নুতন নুতন খেলার সাথী পাই, কাউকে পরের বছর গিয়ে পাই, আবার শুনি কেউ শহরে চলে গেছে। তবে কোনো না কোনো ভাবে একজন খেলার সাথী আমার জুটবেই জুটবে। অন্যবারের মত এবার আমার মনোযোগ কোনো মানব সন্তান আকর্ষন করলো না, করলো একটা অসাধারন কুকুর। দুলালী।
নানীবাড়ী বেড়াতে যাওয়ার প্রথম আনন্দ হলো অতিপ্রিয় কিছু স্বাগতবানী..."ওরে আল্লা, দেখো কারা এসেছে!" অথবা "এতদিন পর নানীবাড়ির কথা মনে পড়লো?" আর সাথে মধুর হাসি, বুকে জড়িয়ে নেওয়া...ইত্যাদি। নানীবাড়ী এসে নামতেই একটা সাদা রঙের কুকুর এসে ঘেউ ঘেউ শুরু করলো, কিন্তু যেন কিছুতেই তা বিরক্তির না, সে যেন আমাদের কে স্বাগত জানালো আর সেটা বোঝা গেলো তার অবিরাম লেজ নাড়া দেখে। আমি ভয় পাবো কি, কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই সে আমার পায়ে মাথা ঘষে কুঁই কুঁই করতে লাগলো।
এবার নানীবাড়ী গিয়ে আমার পরিচিতদের ভেতর শুধু দুজন কে পেলাম। ওরা শুখনো মরিঁচ আর লবন পেষায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো, কুল খেতে লাগবে...আর ছিঁপও তৈরী জোনাকী দিঘিতে পুঁটি কৈ মারতে। আমি শুধু দুলালীকে দেখছি, কেমন আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে আর নুতন বন্ধুত্বের আশা করছে...আমি তাকিয়ে থাকি ওর শুভ্র সুন্দর লোমশ শরীরের দিকে, গ্রামের কোনো কুকুর এত পরিচ্ছন্ন থাকতে পারে, আগে দেখিনি...যা দেখেছি তাকে সবাই নেড়ী কুত্তাই বলে আর সেগুলো অসম্ভব বিশ্রী দূর্গন্ধযুক্তও বটে। যাহোক, আমার সঙ্গী দুজনের কাছে কথায় কথায় জানতে চাইলাম, দুলালীর উৎপত্তির ইতিহাস, ওরা যা বললো তাতে আমি আরো একবার বিশেষ নজরে দুলালীর দিকে তাকালাম; কারন টা আর কিছুই নয়, দুলালী নাকি হিজড়ে কুকুর! আমি জীবনেও কোনোদিন হিঁজড়ে জানোয়ার দেখিনি আর হিঁজড়ে মানুষের মত তারাও অন্য জানোয়ারের বাচ্চাকে নাঁচায় কিনা তাও জানি না। আগ্রহ শতগুন বেড়ে যায় দুলালীর প্রতি।
আমার সাথে সাথেই থাকলো দুলালী, কুল পাড়া, মাছ ধরা, খেঁজুরের ডেইগো দিয়ে গ্রাম্য স্কি বানিয়ে ধুলোময় পথে চালানোর সময়েও সে আমার সাথে সঙ্গ দিয়ে চললো। এরই মধ্যে আমি দুলালীর সাথে কথা বলি, কান মলে দিই, গোঁফ টানি; উপভোগ করতে শুরু করে আমার সঙ্গ সেও। আমি যা খাই তার থেকে কিছু না কিছু দুলালীকে খেতে দিই, লেজ নাড়া থামে না, কৃতজ্ঞতায় ওর বাদামী চোখদুটো চক্চ্ক করে ওঠে। আমি ভাবি, দুলালীকে যদি বাড়ী নিয়ে যেতে পারি তো বেশ হয়! মাকে বলি আমার ইচ্ছে, জবাব আসে, "না"...এত বড় কুকুর কি আর নুতন করে পোষা যায়! গ্রামের কুকুর শহরে কি হাঁঙ্গামা বাধাবে তার ঠিক নেই, মায়ের আশঙ্কা।আমি হাল ছেড়ে দিই শেষমেষ।
পরের বছর ঠিক শীতকালে স্কুল ছুটিতে নানীবাড়ী আসি। দুলালীর কথা জিজ্ঞেস করতেই আমার কুল পাড়া সঙ্গীটি বলে, গেলো গরমের সময় দুলালী গ্রামের সাত জনকে কামড়ানোর পর ওকে গুলি করে মারা হয়েছে...
যত মন্তব্য
ভালো হয়েছে। তবে এই ধরনের লেখা ব্লগ হিসেবে দিলে যথাযথ হবে। আপনার কাছ থেকে আরো লেখা চাই।
apner article er shuru ta darun ....khub bhalo article
ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা আপনাকে। ভালো থাকুন।
আনোয়ার পারভেজ শিশির
শুভেচ্ছা রইলো, নিসর্গ-এর সন্মানিত পাঠক/প্রেমীগনকে।
আনোয়ার পারভেজ শিশির