নায়াগ্রা আমাকে টানে। খুবই টানে। কানাডার অন্টারিওতে থাকে অথচ নায়াগ্রা দেখেনি এমন মানুষ পাওয়া বিরল। ছোটবেলা থেকে যার কথা শুনে এসেছি কানাডায় আসার পনর দিনের মাথায় তার সাথে প্রথম দেখা। সেই থেকেই নায়াগ্রার প্রেমে পড়েছি। কতবার গিয়েছি তার হিসাব নেই। এখন নায়াগ্রা থেকে অনেক দূরে থাকি, তাই ইচ্ছে থাকলেও যাওয়া হয়ে ওঠেনা।
দিনের নায়াগ্রা অনেকবার দেখা হলেও রাতের নায়াগ্রা কখনোই দেখা হয়নি। বাসা থেকে নায়াগ্রা প্রায় ৫ ঘন্টার ড্রাইভ। এখন সূর্য ডোবে পাঁচটায়। দুপুরে রওনা হলে নায়াগ্রাতে এক ঘন্টা থাকলেও ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা বেজে যাবে। তাই ঠিক হলো ওয়াটারলুতে রাত কাটানো হবে।
সন্ধ্যা ৬টার দিকে নায়াগ্রা পৌঁছি। কয়দিন পরেই নিউইয়ার। ওপাড়ে আমেরিকার নিউইয়র্ক স্টেটের বাফলো শহর। দলে দলে মানুষ এপার ওপার করছে। আলো ঝলমলে নায়াগ্রা শহর যেন আমেরিকার লাস ভেগাস (শোনা কথা)।
২৫শে ডিসেম্বর ছিল বলে কাছের পার্কিং লট ফ্রি। নাহয় ২০ ডলার গুনতে হতো। গাড়ি রেখে ক্যামেরা ঘাড়ে নিয়ে মেয়ের স্ট্রলার ঠেলতে ঠেলতে হাজির হলাম টেবল রকে। এটা হলো ফলসের সবচেয়ে কাছের একটা স্থান। ইতিহাস জানিনা, ততটা আগ্রহ নেই, তাই এর বেশি বলতে পারছিনা।
নায়াগ্রা রিভার রোডের একপাশে ক্যাসিনো, শেরাটন আর ম্যারিয়ট হোটেল। তার অনেক নিচে আমরা দাঁড়িয়ে। অন্যপাশে ফলস্। ঠান্ডায় হাতের আঙ্গুল জমে যাচ্ছিল। কোনমতে কয়েকটা ছবি তুললাম।
বেশ খানিকটা উপর থেকে আলো ফেলা হয়েছে ফলস্-এর উপর। লাল, নীল, সবুজ, সাদা আর হলুদ আলোয় একেক সময় একেক রকম লাগছে অপরূপা নায়াগ্রাকে।
ফলস্-এর অদূরে চলছে আলোক-উৎসব। দ্বীপের মত একটা জায়গা, চারপাশে ইউ-আকৃতির রাস্তা। রাস্তা দিয়ে খুবই ধীরে গাড়ি চালিয়ে দেখতে হয় আলোকসজ্জা। গাড়ি থামানো যায়না। তাই হাতে নিয়েই কয়েকটা ছবি তুলেছি।
আলোক-উৎসবে ঢুকতেই হাতের ডানে পড়ে ডাউনোসর আর পুরাকালের সেই গরুড় পাখি। নিয়নের আলো জ্বলছে আর নিভছে--এভাবেই দেখা গেলো ডাইনোসরের পাতা খাওয়ার দৃশ্য।
তারপরে একে একে হরিণে পাল, গাছের সারি আর নোঙর করা নৌকার দৃশ্য। অদ্ভুদ সুন্দর সেই অনুভূতি। দ্বীপের মাঝখানে সাজানো হয়েছে এসব। চারপাশে পানি যা ঠান্ডার কারণে জমে গেছে।
নৌকা যেন থেমে আছে কোন এক ব্যস্ত বন্দরে। নৌকার উপরে সান্তাক্লজ একে একে উড়িয়ে দিচ্ছে পাখি। নৌকা থেকে নেমে আসছে মূজ, মেরু ভল্লুক, বিভার, খরগোশ আরো নাম না জানা কোন এক প্রাণি। সবকিছু মিলিয়ে কানাডার প্রতিনিধিত্বকারি এই সব আলোকসজ্জা তুলে ধরেছে সময়কে।
বের হওয়ার পথে ডোনেশন বাক্স নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুইটি মেয়ে। এইসব আলোকসজ্জার সবকিছুই ফ্রি। আপনি ইচ্ছে করলে ১-২ডলার দিলেও দিতে পারেন। সবাই দেখলাম কাগজের নোট বার করে দিচ্ছে। টাকা পকেটে রাখা বন্ধ করেছি বহু আগেই। গাড়িতে ২ডলারের একটা কয়েন পেলাম, সেটাই দিলাম।
ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। শেষ হলো একটি সুন্দর দিন।