এদেশে শকুনের যেক’টি প্রজাতি আছে তাদের মধ্যে বাংলা শকুন ছাড়া প্রায় সব ক’টি জাতই হারিয়ে গেছে। বাংলা শকুনও এখন মৃত্যুপথযাত্রী। তাদের টিকে থাকার জন্য খাবার আর আবাস্থল নেই বললেই চলে। সিলেটের গভীর বন আর সুন্দরবনে কালেভদ্রে শকুনের দেখা মেলে।
আসলে নামে শকুনকে ছোট বড় প্রায় সবাই চেনেন। সত্তরের দশক পর্যন্ত এদেশে শকুনের দল সহজেই চোখে পড়ত। নব্বইয়ের গোড়ায় দেখেছি মরা গরু খেতে শকুনের দল কোথা থেকে যেন হাজির হতো। ভাগাড়ে শকুন আর কাকের চেঁচামেচিতে গ্রামের লোকজন জমে যেত। লোকমুখে শোনা যায়, গরু মারা গেলে কাক শকুনকে দূরদেশে খবর দিতে যায়। আর ফেরার পথে ছোট্ট কাক দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে না পেরে শকুনের পিঠে চড়ে বসে। এর কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। আসলে শকুন আকাশের অনেক উঁচুতে উঠে ডানা মেলে ঘন্টার পর ঘন্টা উড়তে থাকে। এদের দৃষ্টিশক্তি এতই প্রখর যে মাটিতে অথবা পানিতে ভেসে থাকা যেকোন মরা বস্তু সহজেই দেখতে পায়। তবে শকুনের ঘ্রাণ শক্তি নেই। মাত্র এক প্রজন্মেও মধ্যে শকুন হারিয়ে গেলেও এ নিয়ে এদেশে এতদিন পর্যন্ত কোন আলোচনা হয়নি। অথচ শকুন মানুষের শত্রু নয় বরং বন্ধুই।
৫ই সেপ্টম্বর আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস। এবারই প্রথম এদেশে দিবসটি পালন করছে বাংলাদেশ শকুন গবেষণা ও সংরক্ষণ পোগ্রাম, ওরিয়েন্টাল বার্ড ক্লাব, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, ডব্লিউআরসিসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন’। সম্প্রতি এদেশে শকুনের কি অবস্থা তার একটি জরিপ পরিচালনা করে বাংলাদেশ শকুন গবেষণা ও সংরক্ষণ পোগ্রাম। তাদের গবেষণায় শকুন হারিয়ে যাবার ভয়াবহ এক চিত্র পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও বাংলাদেশ নেচার স্ট্যাডি এ্যান্ড কনজারভেশন ইউনিয়নও দীর্ঘদিন ধরে শকুনের জরিপ করে আসছে।
শকুনের জরিপে গত বছর হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে বাংলা শকুনের একটি বড় দল দেখা গিয়েছিল। পুরাতন দু’টি আমগাছে বাঁসাও বেঁধেছিল তিন জোড়া শকুন। মাত্র এক মাসের মাথায় আমগাছগুলো কেটে ফেলা হয়। ফলে বহুদিন পর বাংলাদেশে দেখা শকুনের বাসায় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়নি। পাখি বিশেষজ্ঞদের ধারণা আর হয়ত শকুন এদেশে বাসা করার আস্তানা পাবেনা। যে কয়টি শকুন এদেশে টিকে আছে তাও হারিয়ে যাবে। কিন্তু এই দুঃসংবাদ কিছুটা হলেও আশার মুখ দেখল। গত মাসে শ্রীমঙ্গলের গভীর বনে দেখা মিলল প্রায় ১৬টি শকুনের বড় একটি দল। ধারণা করা হচ্ছে এদেশে এর চেয়ে বড় শকুনের দল আর নেই। শকুনের বাসা পাওয়া না গেলেও ঐ এলাকায় শকুনের বাসা আছে বলে পাখিদেখিয়েরা বলছেন।
বাংলাদেশে ৫ প্রজাতির শকুনের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দেখা যায় বাংলা শকুন। এর বৈজ্ঞানিক নাম জেপস বেঙ্গালেনসিস (Gyps bengalensis)। এদেশে বেশী দেখা যেত বলেই তাদের নামের শেষে বাংলা শব্দটি চলে এসেছে। এখন গোটা পৃথিবীতেই এর অবস্থা খুবই ভয়াবহ। সংখ্যায় দশ হাজারের বেশী হবেনা। বাংলাদেশে বাংলা শকুন এখন বিরল প্রজাতি। সব মিলে এদেশেও এদের সংখ্যা ২০০ এর বেশী হবে না। তাও আবার বেশীরভাগই দেখা যায় সুন্দরবন এলাকায়। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এদেশও শকুন শূন্য হয়ে পড়বে।
ঢাকার টঙ্গী এলাকায় একসময় শকুন দেখা যেত। এখনও দু’একটির দেখা মিলে চিড়িয়াখানার আশেপাশে। এদেশ থেকে শকুন হারিয়ে যাবার অন্যতম কারণ হল প্রজননের জন্য আবাস্থলের অভাব। এরা সাধারণত বট, শিমুল, দেবদারু, তালসহ বড় বড় দেশী গাছে বাসা বাঁধে। কিন্তু এসব দেশী গাছের আজ বড়ই অভাব। একজোড়া স্ত্রী-পুরুষ বছরে মাত্র একবার একটিমাত্র ডিম পেড়ে বাচ্চা ফুটায়। কোন কোন সময় দু’টি ডিমও দিতে পারে। ফলে এদের সংখ্যা বৃদ্ধির হারও খুবই কম। এছাড়া বাংলাদেশসহ পুরো এশিয়ার গবাদিপশুকে ডাইক্লোফেনাক নামক ঔষধ সেবন করানো হয়। ফলে গরু মারা যাবার পরও তার কিছু কার্যক্ষমতা বজায় থাকে। শকুন মরা গরু খেলে তার শরীরে ঔষধের ক্রিয়ায় মৃত্যু হয়। এছাড়া বর্তমান সময়ে গরু মারা যায় কম বা গেলেও পুঁতে ফেলা হয়। ফলে দিন দিন তাদের খাবার একেবারেই কমে এসেছে এবং এরই ফলে হারিয়ে গেছে প্রায় ৯৯.৫ শতাংশ বাংলা শকুন।
ভারত সরকার ক্লোফেনাক জাতীয় ঔষধ নিষিদ্ধ করেছে। ভারতে এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ক্লোফেনাক ট্যাবলেট একটি শকুনকে খাওয়ানোর কিছুক্ষণ পরেই মারা যায়। এই ঔষুধের বিষক্রিয়ায় তাদের কিডনিতে পানি জমে যায়। ভারত সরকার ঔষুধটিকে নিষিদ্ধ করলেও বাংলাদেশ সরকার কিন্তু নিষিদ্ধ করেননি। বরং এদেশ থেকেই ভারতে পাচার হচ্ছে ঔষধটি।
পরিবেশের জন্য শকুন খুবই মূল্যবান একটি পাখি। হবিগঞ্জে এদের বাসা পাওয়া খুবই আশার কথা। ভারতে শকুনের ক্যাপটিভ ব্রিডিং শুরু হয়ে গেছে। কাজেই শকুনকে হারিয়ে ফেলার আগেই আমাদেরকেও সচেতন হতে হবে। বাড়াতে হবে এদের প্রজনন ক্ষেত্র অথবা ক্যাপটিভ ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে এদের সংখ্যা বাড়িয়ে ছেড়ে দিতে হবে পরিবেশে।
যত মন্তব্য
"biloptir pothe banglar shokun"...article ta porlam...shokun der picture dekhlam...onek thnx......manush_rupi banglar shokun ra kobe bilopto hobe....bangla sujola_shufola_soshow_shamola hobe....kobe??????
আপনার ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগলো। নিসর্গ ভিজিটের জন্য ধন্যবাদ।