Share |

শীতল কোমল কুসুম্বা

কুসুম্বা মসজিদ
মুনতাসির মামুন / kewkradong.com

"কৃষ্টি" নামে একটা পত্রিকা দেখেছিলাম অনেক আগে বাবার কাছে। এখনও মনে আছে নীল মলাটের মাঝে ক্ষয়ে যাওয়া পাতার মত দেখতে একটা দালান গোছের কিছু একটার ছবি। কোন মসজিদ-- তার পরিচয় মিলেছিল অনেক পরে যখন সদলবলে বাবাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে পিকনিকে যাওয়া হয়েছিল। আমার নাজুক মনে ভীম দর্শন সেই অবয়ব আটকে ছিল অনেক কাল। কুচকুচে কালো দেয়ালের হীম শীতল স্থাপনার রূপের দিকে চেয়ে না দেখা একটা তাড়না বোধ যেগেছিল তখন। মনে হয় ভয়ই ছিল তাই তাবৎ দল যখন বাক্সপেটরা নিয়ে ভিতরে ঢুকলো আমি মায়ের আঙ্গুল ধরে দাড়িয়েছিলাম আর উল্টো দিকের পুস্করিনির পাশে। চন্দ্রাকারে বেঁকে যাওয়া খেজুর গাছে পা ঝুলিয়ে বসে সে বেলা পার করে দিয়েছিলাম। তবে সবাই যখন ফিরে এলো তখন জানতে পারলাম এটা একটা মসজিদ ছিল, তাও আবার ছেলে-মেয়ে সবার জন্য।

প্রায় দেড় যুগ পর আবার সেই স্থানেই যে যাওয়া হবে তা পরিকল্পনায় ছিলনা। তবে মান্দা হয়ে গাড়ি যখন এগুচ্ছিল বিকেলের শেষ আলোতেও 'কুসুম্বা জামে মসজিদ’ না দেখে এবার আর ফিরতে ইচ্ছে হলো না। পরিবর্তন এসেছে বেশ, আগে চারধারের দেয়ালের পাশে যে এল-প্যার্টান এর দালান করা হয়েছে তা মনে হয় ছিলনা আর অজুখানা? তাও ছিল না মনে হয়। কিছুটা বেমানান হলেও করার তো কিছু নাই, সামনের পুকুড়ে নামতে সিড়ি ভাঙতে হয় কুড়িখানেক। এত সময় এখন কার আছে।

আগের সে ভয় এবার আর ছিল না। মূল ফটকের পাশে লালসালুর দোকান দেখেই মনে হলো কিছুটা পর্যটনের হাওয়া এখানেও লেগেছে। ঈদের পরের দিন, মানুষ এমনেতেই কম, বিকালের রোদে কিছু বাচ্চাদের ছোটাছুটিতে ধূলোর সাথে তক্তপোশের ঝারপোচের ধূলোয় ধোঁয়াশা উঠোন পেরিয়ে অজুখানায় সেই ধূলো পরিস্কার করে যখন ঢুকলাম তখন কেন ভয় পেয়েছিলাম তা বুঝতে পারলাম। ভিতরে অপ্রতুল আলোতে আরও ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছিল কালো পাথরের দেয়াল আর ইটের গাঁথুনিতে গড়া গম্বুজ গুলো। কুসুম্বা মসজিদের নামকরনে এলাকার নামই দায়ী বলে জানা যায়। আত্রাই নদীর পারের জেলা নাটোরের মান্দা উপজেলার কুসুম্বা নামক গ্রামেই এই মসজিদ অবস্থিত। মূল মসজিদের ঢোকার আগে একটা বড় ফটক ছিল যাতে প্রহরীদের দাঁড়াবার স্থান ছিল বলে মনে করা হয়। স্থাপত্যকলায় অনন্য সাধারণ এই নির্দশনটি আফগানিদের শাসন আমলের শেষ দিকের শুরি শাসক গিয়াশউদ্দিন বাহাদুর শাহ কতৃক নির্মিত হয়েছিল। ভিত্তিপ্রস্তরের কাল অনুসারে হিজরি ৯৬৬ সাল (১৫৫- ৫৯ খৃ:) ছিল এর নির্মাণকাল। তৎকালিন ভারতবর্ষে অন্যান্য শুরি স্থাপত্যকলা থেকে প্রায় পুরোটাই স্বকীয় বৈশিষ্টধারী এই মসজিদের নির্মাণ শৈলীতে বাঙলার প্রভাব প্রকট ভাবে পরিলক্ষিত হয়। মসজিদের ভিতরটাকে দারুণভাবে ভাললাগার কারণ হলো ঈষৎ ধনুর মত বাঁক নেয়া আর্চ গুলোর উপর ইটের তৈরি গম্বুজ যা অক্টাগোনাল আকৃতির থামের উপর যুক্ত।

_MG_5415

আরেকটা বিষয় সবাইকে নাড়া দিতে বাধ্য -- তা হলো এর মিহরাব। কম বেশি সবাই আমাদের পাঁচ টাকার নোটে এর সৌন্দর্য দেখে থাকবেন। টাকার নোটে ছোট আকারের স্থাপত্যকলার অসাধারণ প্রতিমার ব্যপ্তিটা বোঝা না গেলও সরাসরি দেখতে এক কথায় অদ্ভুত। প্রথমটায় একটু খটকা লেগেছিল ছোট মসজিদের থামগুলো কেনই বা এতটা মোটা। পরে বোঝা গেল পাশাপাশি অবস্থিত গম্বুজ গুলোর ভর সামলানর জন্যই পাথরের খুঁটিগুলোকে হতে হয়েছে বেশ পোক্ত। মিহরাবটির আদ্যপান্ত পাথরে খোদাই করা কারুকাজ। দুই পাশের দুই থামে মেঝে থেকে উপরের দিকে গিয়ে মিশে গেছে এক সাথে। মিলিত স্থানে একটি কলস দেখতে পাওয়া যায়। প্রশ্ন এসেছিল এই কলসই বা আসল কেন? প্রথমটায় প্রায় ভিমরি খেতে হয়েছিল থামের দেয়ালের কারুকাজ দখে। প্রায় সাপের মত আঁকাবাঁকা হয়ে নেমে আসা লতা গাছের অবয়ব শেষ হয়েছে একেবারে মেঝের কাছাকাছি এসে। তবে এটা সত্য এই কারুকাজকে যদি কেউ মসজিদের ভিতরে না দেখে বাইরে দেখে, তাহলে এটা মন্দির না মসজিদ এ প্রশ্নে আটকে যেতে বাধ্য। তবে আমার জানতে ইচ্ছা করে কেনই বা শুরিদের স্থাপত্যকলায় এমন ভাবটা এল?

_MG_5392

আমরা থাকার সময়ই আরও বেশ কজন এলেন। কেউ বা নামাজের জন্য আবার কেউবা নিছক আমাদের মত- ভ্রমণের জন্য। মসজিদের ভিতরে মূল ঘরের ভিতরেই পূর্ব কোণে একতলা উঁচু স্থানটি মহিলাদের নামাজের জন্য নির্ধারিত। এখন তাদের জন্য একই ব্যবস্থা আছে কি না তা না জানলেও এর ভিতরের ঢুকতে বাধা দিতে দেখলাম না কেউকে। এটাও একটা মজার বিষয় এবং যথেষ্ট ব্যতিক্রমী।

ঢাকা থেকে যাওয়া দাড়ি টুপি পরা দুজন মানুষ আশপাশটা ঘুরে খাদেম সাহেবের সাথে অতি সাধারণ কথোপকথন শুরু করলেন। তাদের থেকেই জানতে পারলাম - প্রায় পঞ্চাশোর্দ্ধ খাদেম সাহেবের বাবাও এই মসজিদেই থাকতেন এবং বাবার পর তিনিই হাল ধরে আছেন এই মসজিদের। মসজিদ এবং আনুসাঙ্গিকের সাথে খাদেম সাহেবে বয়স এবং চরিত্রটি ঠিক মানানসই। তার উপর জানা গেল এই মসজিদে নাকি জ্বীন নামাজ পড়তে আসে। প্রথমটায় ভয় পেলেও এখন তা গা সওয়া! আমার কাছেও মনে হলো এরকম কিছু একেবারেরই অস্বাভাবিক নয়। পরিবেশটাই যেন কেমন, অবশ্যই রোমঞ্চকর।

কোথায় জানি পড়েছিলাম, যে স্থান ভাল লাগে তার সব ছবি যেমন তুলে আনতে হয় না তেমনি সব কিছু জেনেও আসতে হয় না - তাতে এই স্থানের প্রতি আগ্রহ থেকে যায় পরের বার যারার জন্য। আমার বেলাতেও তাই, খাদেম ভদ্রলোকের সাথে মসজিদের ছাতা পরা মাদুরে বসে অতিপ্রাকৃত ঘটনার বর্ননা শুনতে কেমন লাগবে তার পরানুভুতি এখনই আমার মনে খোঁচা দেয়।

মনে হয় শুধু তারই জন্য শীঘ্র আবার যেতে হবে, কেননা এই শীতের সকালে অদ্ভুত এক সোনালী রোদ পঢ়বে বলে মনে হয়, যা গেল বার বিকালের রোদের চেয়ে আলাদাই হবার কথা।

সূত্র: Ahmad Hasan Dani, Muslim Architecture in Bengal, Dacca, 1961; Catherine B Asher, 'Inventory of Key Monuments', in George Michell (ed), Islamic Heritage of Bengal, Paris: UNESCO, 1984. And http://greenbdinfo.blogspot.com/2008/06/naogaon.html