বৈজ্ঞানিক নাম অনুসরণ করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনে পুরো বৈজ্ঞানিক নাম অনুসরণ বেশ কঠিন। তাই সাধারণ্যে প্রচলিত নামের গুরুত্বও অনেক। অজগর বলতে ঠিক কি বোঝানো হবে এটা নিয়ে তাই সন্দেহ থেকে যায়।
সবচেয়ে ভাল হয় Pythonidae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত সব সাপকে অজগর বলে ডাকলে। আমি এখানে এই নিয়মই অনুসরণ করছি। এজন্যই এই লেখার শিরোনাম "অজগর" না দিয়ে দিয়েছি "ময়াল"। কারণ অজগর বলতে আমরা সাধারণত যে বিশালকায় সাপ প্রজাতিটিকে বুঝি সেটার বৈজ্ঞানিক নাম, Python molurus এবং বাংলায় একে অজগর এবং ময়াল সাপ দুই নামেই ডাকা হয়। আমি যেটা করেছি তা হল, পুরো পরিবারটাকে অজগর বলে পরিবারের এই বৃহদাকার প্রজাতিটিকে বলেছি ময়াল। এটা বাঙালি জীববিজ্ঞানী মহলে স্বীকৃত কি-না জানি, আপাতত জানারও কোন উপায় নেই।
উল্লেখ্য এত ভয়াল হলেও অজগরদের সবাই কিন্তু নির্বিষ। কারও কোন বিষ নেই। অর্থাৎ এরা non-venomous সাপ।
বাংলা নাম: ময়াল সাপ
ইংরেজী নাম: Rock Python
বৈজ্ঞানিক নাম: Python molurus
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
রাজ্য: Animalia
পর্ব: Chordata
উপপর্ব: Vertebrata
শ্রেণী: Reptilia
বর্গ: Squamata
মহাবর্গ: Serpentes
পরিবার: Pythonidae
গণ: Python
প্রজাতি: P. molurus
অঙ্গসংস্থান
অঙ্গসংস্থানের কথা আসলে এই প্রজাতিকে আবার দুই ভাগ করতে হবে। হ্যা, ময়ালের দুটি উপপ্রজাতি আছে।
P. molurus bivitatus - বার্মিজ অজগর। এদের দৈর্ঘ্য ৭.৬ মিটার এবং ওজন ১৩৭ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এদের রং বেশি গাঢ়। মূল চামড়ার রং থাকে কালো, এর উপর গাঢ় বাদামী রং এর আয়তাকার ছোপ ছোপ দেখা যায়। এদের মাথার আগায় আবার একটি তীর আকৃতির ছোপ দেখা যায় যার মাধ্যমে মোজাইকের সূচনা ঘটে।
P. molurus molurus - ভারতীয় অজগর। এরা অবশ্য বার্মিজদের মত লম্বা হতে পারে না। দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ৬.৪ মিটার এবং ওজন খুব বেশি হলে ৯১ কেজি হতে পারে। এদের রং একটু হালকা। হালকা বাদামী ছোপ থাকে, ক্রিম রং এর পটভূমির ওপর। এদের মাথার তীরের মত ছোপটা সম্পূর্ণ না, আংশিক।
প্রজনন ও জীবনেতিহাস
এরা ২-৩ বছর বয়সে যৌন পরিপক্কতা অর্জন করে। দেহের ওজন ঠিক থাকলে এ সময়ই তারা সঙ্গী খোঁজা শুরু করে। সেক্সের জন্য পুরুষ ময়াল প্রথমে স্ত্রী ময়ালের দেহ পেঁচিয়ে ধরে। এরপর তার জিহ্বা দিয়ে স্ত্রী ময়ালের মাথা ও মুখ খুব দ্রুত চেটে দিতে থাকে। তাদের খাদ্যনালী দুটো এক লাইনে আসার পর পুরুষ ময়াল তার অব্যবহৃত পা দিয়ে স্ত্রীটির দেহ মেসেজ করে দেয়। খাদ্যনালীর শেষ অংশটা এক লাইনে আসা খুব জরুরী। এসব প্রাণীতে খ্যাদ্যনালীর শেষ অংশকে বলে ক্লোকা। যথেষ্ট উত্তেজিত হওয়ার পর পুরুষ ময়াল তার একটি হেমিপেনিস স্ত্রীর ক্লোকা দিয়ে প্রবেশ করায়। উল্লেখ্য পুরুষ সাপদের দুটি হেমিপেনিস থাকে। রতিক্রিয়া চলে ৫ থেকে ৩০ মিনিট। ৩-৪ মাস পর স্ত্রী ময়াল ১০০ টির মত ডিম পাড়ে যার প্রতিটির গড় ওজন ২০৭ গ্রাম। স্ত্রীরা কুণ্ডলি পাকিয়ে ডিমের ওপর তা দেয়। ২-৩ মাস তা দিতে হয়। এসময় তারা দেহের পেশী সংকোচনের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার চেয়ে তার শরীরের তাপমাত্রা বাড়ায়। তা দেয়ার পুরোটা সময় মা ডিমের কাছে থাকে। ডিম ফুটে বাচ্ছা বেরোনর পর তাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না। কারণ বাচ্চাগুলো খুব দ্রুতই আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠে।
স্বভাব ও খাদ্যাভ্যাস
এরা একা থাকতে পছন্দ করে। প্রজন্ন ছাড়া অন্য কারণে এদের যুগলবন্দি অবস্থায় দেখা যায় না। ভারতীয়রা তো কোন বিপর্যয় না আসলে বাড়ি ছেড়ে বেরোতেই চায় না। শিকার ধরার জন্য প্রথমে গন্ধের সাহায্য নেয়। কিংবা শিকারের দেহ তাপমাত্রাও অনুসরণ করতে পারে। ময়ালদের দেহে শিকারের দেহের তাপ বোঝার জন্য আলাদা প্রক্রিয়া আছে। এরা প্রধানত সমতল ডাঙায় থাকে, তবে কখনও কখনও গাঠে উঠতে দেখা যায়। ভারতীয়দের মাঝেমধ্যে পানির আশপাশেও পাওয়া যায়। এরা একেবারে পাকা সাতারু। একবার ডুব দিয়ে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট পানির নিচে থাকতে পারে। ভারতীয়রা শীতকালটা ঘুমিয়ে কাটায় যাকে আমরা সচরাচর শীতনিদ্রা বলে থাকি। অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ময়াল ভয়ে ভীত থাকার কোন কারণ নেই।
ভৌগলিক বণ্টন

ওপরের ছবিতেই তাদের ভৌগলিক বণ্টন বোঝা যাচ্ছে: পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা, নেপালের দক্ষিণাংশ, মায়ানমার, দক্ষিণ চীন, থাইল্যান্ড, লাওস, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার কিছু অংশ। কোন জায়গায় কোন উপপ্রজাতিগুলো থাকে সেটাও মানচিত্র থেকে বোঝা যাচ্ছে:
লাল = P. m. molurus
ধূসর = P. m. pimbura (একে অবশ্য উপপ্রজাতি হিসেবে ধরা হয় না। মোলারাসের মধ্যেই প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়।)
সবুজ = P. m. bivittatus
হলুদ = সম্ভাব্য ইন্টারগ্রেডেশন (অর্থাৎ দুই উপপ্রজাতির মিশ্রণ)
অর্থাৎ বাংলাদেশে দুই উপপ্রজাতির এক প্রকার মিশ্রণ দেখা যায়। ময়ালদের পাওয়া যায় বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অথবা দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের মিশ্র চিরহরিৎ বনে। সে হিসেবে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সুন্দরবন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে।
বাসস্থান
ভারতীয় ময়ালরা তো জলাশয় ও আর্দ্র অঞ্চল ছেড়ে দূরে যেতেই চায় না। সবসময় ভেজা জায়গায় থাকতে ভালোবাসে।
সংরক্ষণ স্ট্যাটাস
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজার্ভেশন অভ নেচার এর স্ট্যাটাস নির্ধারণ প্রক্রিয়া অনুসারে ময়ালদের সংরক্ষণ স্ট্যাটাস হচ্ছে:
Nearly threatened - অর্থাৎ এখন বিপদাপন্ন না হলেও অচিরেই তারা বিপদাপন্ন হয়ে পড়বে।
মাঝেমাঝে অবশ্য এদেরকে লিস্ট কনসার্ন এর মধ্যেও ফেলা হয়।
বাংলাদেশে অবশ্য বার্মিজ এবং ভারতীয় দুটি প্রজাতিকেই বিরল বিবেচনা করা হয়। এজন্য দেশী প্রেক্ষাপটে ময়াল সাপ একটি বিপন্ন প্রজাতি।
ব্যবহার
ভবিষ্যতে পোষা প্রাণী বানিজ্যে এর উল্লেখযোগ্য পসার হতে পারে। তবে বর্তমানে ভারতীয় ময়ালদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব তার চামড়ার কারণে। ফ্যাশন বানিজ্যে এটা খুবই জনপ্রিয়, মূলত ভয়াল ও অদ্ভুত মোজাইকের কারণে। এছাড়া কিছু অঞ্চলে খাদ্যের জন্যও এদের শিকার করা হয়।
কিন্তু ভবিষ্যতে এই প্রজাতির বিলুপ্তি ঠেকানোর জন্য আমাদের এখন থেকেই সতর্ক হওয়া উচিত। অজগর শিকার বন্ধ করা উচিত, কিংবা অন্তত কমিয়ে আনা উচিত।
তথ্যসূত্র
* Python molurus - এনসাইক্লোপিডিয়া অভ লাইফ (EOL)
* Python molurus - ইংরেজি উইকিপিডিয়া
* অজগর - বাংলাপিডিয়া