Share |

বিলুপ্তপ্রায় লামচিতা

লামচিতা বা মেঘচিতা
তোফায়েল আহমেদ / www.dailykalerkantho.com

কক্সবাজারের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে দেশের একমাত্র 'লামচিতা' বাঘের ছবি ও খবর ছাপা হয়েছে ১৪ মার্চ কালের কণ্ঠে। ওর বয়স ছয় বছর এবং ওটি এখনো কুমারীজীবন যাপন করছে সঙ্গীর অভাবে। ২০০৪ সালে ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ি এলাকায় এটি শিশু বয়সে গারোদের হাতে ধরা পড়ে। এর বৈজ্ঞানিক নাম নিওফেলিস নেবুলোসা। ক্যাটস পরিবারের সদস্য। একে লামচিতা বা মেঘলাচিতা বলে। তবে চিতার সঙ্গে নয়, জিনগতভাবে ব্যাঘ্রকুলের সঙ্গেই এদের মিল বেশি। বিলুপ্তপ্রায় বলে এদের সংরক্ষণের প্রয়োজনে প্রজননে বেশি জোর দিচ্ছে সারা বিশ্ব। ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, চীনের দক্ষিণাঞ্চল, সুমাত্রা, জাভা, বোর্নিও ও বাংলাদেশের সিলেট-ময়মনসিংহ অঞ্চলে এদের দেখা যায়। দ্রুত কমে আসা এই অমূল্য প্রাণীকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য ভারতের পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার সিপাহিজলা অভয়ারণ্যে সংরক্ষণ প্রজননে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। ২০০৮ সালে সিপাহিজলা অভয়ারণ্যকে 'ক্লাউডেড লেপার্ড ন্যাশনাল পার্ক' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

১৫ নভেম্বর ২০০৯ আনন্দবাজার পত্রিকায় এ বিষয়ে আগরতলার উত্তম সাহার লেখা একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন পাই। আমার মেয়ে মেঘনা এটি আমাকে পাঠায়। লোমশ দেহে মেঘের মতো ছাপযুক্ত এই প্রাণিকুলের বংশবিস্তারে একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় থাইল্যান্ডে সংরক্ষণ প্রজনন নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়েছে। সিপাহিজলায়ও এখন এ পরীক্ষা চলছে।

খাঁচাবন্দি অবস্থায় প্রজনন হতো বলে একে বলা হতো ক্যাপটিভ ব্রিডিং বা খাঁচা-প্রজনন। এখন বিলুপ্তপ্রায় ৬১ প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণের জন্য প্রজননের এ উদ্যোগকে বলা হচ্ছে কনজারভেটিভ ব্রিডিং বা সংরক্ষণ প্রজনন। দুই পদ্ধতির ফারাক বলতে খাঁচার মাপজোখ, অবস্থান নিয়ে আগে এত কড়াকড়ি ছিল না। এখন এ নিয়ে আন্তর্জাতিক নানা নিয়মনীতি যুক্ত হয়েছে। তাই নির্ধারিত মাপের খাঁচা ও অন্যান্য পরিকাঠামো যুক্ত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মেঘচিতার সংখ্যা বাড়ানোর জন্য এত দিন এত চাপ ছিল না। এখন ভারত সরকার উদ্যোগ নেওয়ায় সারা বিশ্ব এই প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য সিপাহিজলা অভয়ারণ্যের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ এই পার্ককে জাতীয় পর্যায়ের বলা হলেও শুধু মেঘচিতার জন্য নির্দিষ্ট এমন উদ্যান সারা বিশ্বে এই একটিই।

আপাতত ১৫টি মেঘচিতা সিপাহিজলার খাঁচায় রয়েছে। এর মধ্যে পূর্ণবয়স্ক ১২টির রক্ত ও অন্যান্য নমুনা হায়দরাবাদের পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে জিন সম্পর্কিত রিপোর্ট নেওয়া হয়েছে। এতে পাঁচটি প্রাণী সংরক্ষণ প্রজননের উপযুক্ত বিবেচিত হয়েছে। অভয়ারণ্যের পরিচালক অজিত ভৌমিক বলেছেন, টেকনিক্যাল কমিটির ছাড়পত্র মিললে ২০১০ সাল থেকে 'সংরক্ষণ প্রজনন' শুরু হবে। তারপর এই বিশেষ পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া বাচ্চাগুলো উপযুক্ত সময়ে জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হবে এবং আশা করা যায়, তাতে এদের সংখ্যাও বাড়বে।

সিপাহিজলায় ১৫টি ও বাইরে দার্জিলিং, গুয়াহাটি, অরুণাচল ও শিলংয়ে আছে ছয়টি মেঘচিতা। শিলং ছাড়া সব কটি সিপাহিজলা থেকে নেওয়া। দার্জিলিং 'পদ্মজা নাইডু জুওলজিক্যাল পার্কে' আগে থেকেই একটি মেঘচিতা ছিল। সেটিকে সিপাহিজলায় দিয়ে একই বয়সের দুটিকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রাণী অন্য জায়গায় দেওয়ার ব্যাপারেও এখন সিপাহিজলা কর্তৃপক্ষ খুব সতর্ক। কারণ ১৯৯২ সালে জয়পুর চিড়িয়াখানা এক জোড়া মেঘচিতা চেয়ে নিয়েছিল। কিন্তু সেগুলো সেখানে খুব বেশিদিন বাঁচেনি। এর পর থেকেই বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীটি হস্তান্তরের ব্যাপারে সতর্ক পার্ক কর্তৃপক্ষ।

জীব অভিধানের লামচিতা, ত্রিপুরার মেঘলা চিতা বা মেঘচিতা বা গেছোবাঘের জিনগতভাবে বাঘের সঙ্গেই মিল বেশি। কাজেই বাঘের সঙ্গে সংকরায়ণও হতে পারে। মেঘচিতা সাধারণত বাঁচে ১০-১১ বছর। জন্মের বছর দুয়েকের মধ্যেই এরা প্রজননক্ষম হয়। সাধারণত থাকে পাহাড়ে ২০০ মিটার উচ্চতায়। বাঘ গাছে চড়ায় পটু না হলেও এরা খুব ওস্তাদ। বাঘ বা রয়েল বেঙ্গল টাইগার ভয়ে বা জীবন বাঁচাতে কদাচিৎ গাছে উঠতে পারলেও মাথা নিচু করে গাছ থেকে নামতে পারে না। মেঘচিতা মাথা নিচু ও পা ওপরে রেখে ডাল ধরে ঝুলতে পারে। এ জন্য এর নাম গেছোবাঘ। তিন ফুট লম্বা এই বাঘের লেজ হয় দেহের সমান। ২০০৮ সালের গণনায় সিপাহিজলা পার্কে খাঁচার বাইরে আরো ৯টি বাঘ রয়েছে।

বাঘ বিশেষজ্ঞ কাজী জাকের হোসেন তাঁর 'বাঘ' বইয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিড়াল (ক্যাটস) প্রজাতির তালিকা দিয়েছেন। সেগুলো হলো_ডোরা বাঘ (প্যানথিরা টাইগ্রেস), সিংহ (পি. লিও), চিতাবাঘ (পি. পারভাস), তুষার বাঘ (পি. আনসিয়া), গেছোবাঘ বা মেঘচিতা (নিওফেলিস নেবুলোসা), সোনালি বিড়াল (ফলিস টেমিনেকি), মেছো বিড়াল (ফে. ভাইবেরিনা), চিত্রা বিড়াল (ফে. বেঙ্গলেনসিস)। এ ছাড়া বনবিড়াল জাতের আট রকমের প্রজাতি আছে বা ছিল বাংলাদেশ ও ভারতে। মানুষের পিটুনিতে এসব বিলুপ্তপ্রায় নিরীহ প্রাণী মরে খবর হয়।

কবি জসীমউদ্দীন তাঁর 'বাঙ্গালীর হাসির গল্প ২য় খণ্ড' বইয়ের 'টিপটিপানী' গল্পে অদ্ভুত সব বাঘের নাম লিখেছেন। সেগুলো হলো_এঁড়ে বাঘ, হেঁড়ে বাঘ, কুতকুতানি বাঘ, মিনমিনানি বাঘ, জ্বরো বাঘ, কেশো বাঘ। আর সেই সময় বা আজ থেকে ৯০ বছর আগেও বাংলাদেশের সব জেলায় কোনো না কোনো প্রজাতির বাঘ ছিল। আমাদের জেলাওয়ারি লোককাহিনীতেও তা আমি পড়েছি। জেলা গেজেটিয়ারগুলোও তার সাক্ষ্য দেয়।

লেখাটি ২০ মার্চ ২০১০, কালের কন্ঠ থেকে নেয়া হয়েছে নিসর্গের পাঠকদের সাথে শেয়ার করার জন্য। মূল ছবির লিংক এখানে


যত মন্তব্য

"Lam_chita".....ei rokom tiger ase tao amader deshe dekhlam nd article tao bhalo laglo