| বিপন্ন প্রাণীকুল ও পরিবেশ |
|
|
| লিখেছেন Ittefaq Editorial | |
| Thursday, 08 February 2007 | |
|
The Daily Ittefaq, February 8, 2007: বঙ্গোপসাগর উপকূলে ডিম ছাড়িতে আসিয়া জীবন বিপন্ন শত শত সামুদ্রিক কচ্ছপের। গত সোমবার পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত এক খবরে বলা হয়, কক্সবাজার সৈকতে প্রতিদিন ভাসিয়া উঠিতে দেখা যাইতেছে মরা কচ্ছপ। কোথাও কোথাও মৃত ডলফিনও চোখে পড়ে। অভিজ্ঞজনেরা বলেন, এইসব কচ্ছপের আদি নিবাস আটলান্টিক, প্রশান্ত ভারত মহাসাগর। শীতের মৌসুমে প্রজনন এবং ডিম পাড়িবার জন্য ইহারা সুদীর্ঘ জলপথ পাড়ি দিয়া চলিয়া আসে বঙ্গোপসাগরে। যেসব কচ্ছপের ডিম ছাড়িবার সময় হয়, সেগুলি রাত্রিকালে উঠিয়া আসে উপকূলীয় ডাঙ্গায়। ডিমভার মুক্ত হইবার পর আবার সমুদ্রজলে আশ্রয় লয়। এই কচ্ছপের পোশাকি নাম অলিভ রিডলি। বঙ্গোপসাগরে আসিয়া অলিভ রিডলিরা কারেন্ট জালের ফাঁদে পড়িয়া মারা যাইতেছে সমানে। প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা যায়, কক্সবাজারের নাজিরারটেক হইতে শুরু করিয়া সেন্টমার্টিন পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার সাগর উপকূল জুড়িয়া পাতিয়া রাখা জেলেদের কারেন্ট জালই কাল হইয়াছে কচ্ছপদের। নিষিদ্ধ কারেন্ট জালে আটকাইয়া উহারা মরিতেছে বেশুমার। কখনও কখনও ডলফিনও আটকা পড়িয়া মারা যাইতেছে। মৃত কচ্ছপ ও ডলফিন ভাসিয়া উঠায় পানি ও বাতাস দূষিত হইয়া চলিয়াছে একইসঙ্গে। কক্সবাজার সৈকতের নির্মলতাও নষ্ট হইতেছে দুর্গন্ধে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের এ এক জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত। জলে ও স্থলে প্রাণীকুল আজ কোথাও নিরাপদ নয়। পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্যও এ এক মারাত্মক হুমকি। সমস্যাটি কেবল বাংলাদেশে নয়, বিশ্ব জুড়িয়াই ব্যাপকরূপে মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছে। প্রতিদিন কোনো না কোনো প্রাণী প্রজাতি নিঃশেষ হইয়া যাইতেছে। বিরল প্রজাতির তালিকাভুক্ত হইয়াছে এবং হইতেছে নদী-সমুদ্রের, অরণ্যের ও জনপদের অনেক প্রাণী ও পাখি, জন্তু-জানোয়ার। নিঃশেষ হইতেছে বন-বনানী, নদী-নিসর্গ। বনজঙ্গল ক্রমাগত বৃৰবিরল হইতেছে, কোথাও কোথাও সংকোচিত, এমনকি, অসত্দিত্বহীন হইয়া যাইবারও বহু দৃষ্টানত্দ আছে দেশে ও বিদেশে। নদী ও সমুদ্রের পানি একদিকে দূষণের শিকার হইতেছে, অন্যদিকে, বিশেষ করিয়া নদী-নালা, জলাশয় শুকাইয়া মৃতপ্রায়। এই পরিস্থিতিতে প্রাণীকুলের জীবন বিপন্ন। উহাদের বাঁচিয়া থাকা কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। তাহার ওপর আছে অবিবেচক মানুষের জুলুম। সব মিলাইয়া এক বেদনাদায়ক পরিস্থিতি। বাংলাদেশের প্রাণী ও পক্ষিকুলের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকাইলে পীড়াবোধ না করিয়া পারা যায় না। এক হিসাব হইতে জানা যায়, বাংলাদেশে এখনও ৮৪০ প্রজাতির বণ্যপ্রাণীর অস্তিত্ব রহিয়াছে। এর মধ্যে পাখি সবচাইতে বেশী। প্রায় ৫৭৮ রকমের পাখির দেখা মিলে এই দেশের বনবাদাড়ে ও জনপদে। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১১৯ প্রজাতির। সরিসৃপ দেখিতে পাওয়া যায় ১২৪ ধরনের। উভচর প্রাণী আছে বাংলাদেশে কম করিয়া হইলেও ১৯ প্রকারের। সুন্দরবনে এক্ষণে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা কত বলা মুশকিল। তবে সংখ্যাটি পাঁচশতের কাছাকাছি হইতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট এবং সুন্দরবন মিলাইয়া এই দেশে প্রায় ৮০ হাজার হরিণ আছে। বন্যহাতিও নাকি আছে চারশতাধিক। এর বাহিরে সরিসৃপ, স্তন্যপায়ী এবং পাখ-পাখালি কত যে আছে বলিয়া শেষ করা যায় না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ক্রমাগত সব ধরনের প্রাণী ও পক্ষির সংখ্যা হ্রাস পাইয়া চলিয়াছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ১৭ প্রজাতির বন্যপাণী নির্বংশ হইয়া গিয়াছে। ওইসব প্রাণী ও পাখির নামও সাধারণ মানুষ ভুলিতে বসিয়াছে। দেশে প্রায় ৫০ ধরনের পশু-পাখির অস্তিত্ব আজ চরম হুমকির সম্মুখীন। পশু-পাখিদের এইরূপ হুমকির কারণ কিন্তু সৃষ্টি করিয়া চলিয়াছি আমরাই। জন্তু-জানোয়ারের আবাসস্থল বনজঙ্গল। পাখিরাও বাঁচে না গাছ-গাছালির আশ্রয় ছাড়া। এদের অনেকের খাবার মাছ এবং কীট-পতঙ্গ। বন নিঃশেষ হইয়া গেলে পশুরা থাকিবে কোথায়? নদীর পানি শুকাইয়া গেলে কিংবা হাজিয়া-মজিয়া, বিষাক্তরূপ ধারণ করিলে জলের প্রাণীরা বাঁচে কেমন করিয়া? আমাদের নদী-নালায় কত জাতের কতরকমের সুস্বাদু মাছ যে ছিল, তাহার ইয়ত্তা নাই। সেইসব দেশী জাতের মাছ একালে খুব কমই পাওয়া যায়। বাংলার নদীতে বর্ষায় ভাসিতে দেখা যাইত অজস্র শুশুক- যাহা আসলে ডলফিন প্রজাতির জলচর প্রাণী। সেই শুশুক এখন বলিতে গেলে দেখাই যায় না। কচ্ছপ পানিতেও থাকে, আবার বনবাদাড়ে ঝরাপাতার সত্দূপের নিচে, ভেজা মাটির তলায়ও লুকাইয়া থাকে। এখন সেই কচ্ছপকুলেরও দুর্দিন। না আছে বন, না আছে নিরাপদ জলরাশি। এমনকি সমুদ্রেও কচ্ছপেরা নিরাপদ নয়। এই অবস্থাটি অর্থাৎ প্রাণীকুলের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি শেষাবধি মানুষের জন্যও কিন্তু অনুকূল নয়। কেননা ইহারাই পরিবেশের ভারসাম্য রৰা করে। নানাভাবে পরিবেশ বাঁচাইয়া মানুষের উপকার করে। কচ্ছপ পানি শোধন করে। মাটি উর্বর করে। কাজেই গাছপালা, জন্তু-জানোয়ার পাখ-পাখালিদের রৰা করার জন্য আমাদের ভাবিতে হইবে। সচেতন হইতে হইবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জীববৈচিত্র্য রৰার পথে হাজাররকমের সমস্যা আসিয়া দাঁড়াইতেছে আমাদের সম্মুখে, যাহা অনুপেৰণীয়। সেইসব সমস্যা-সীমাবদ্ধতা মোকাবিলার জন্য পথ খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সাহায্য লইতে হইবে। মোটকথা জীববৈচিত্র্য রৰায় নির্লিপ্ত থাকিবার অবকাশ নাই এখন আর সামান্যতম। মন্তব্যগুলো (0)
![]() মন্তব্য লিখুন
|
|
| সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 25 February 2007 ) |
| < পূর্বে | পরে > |
|---|