| আন্তর্জাতিক উপকূল পরিষ্কার অভিযান ২০০৭ |
|
|
| লিখেছেন মাসুক আহমেদ | |
| Monday, 12 November 2007 | |
![]() উপকূল পরিষ্কার অভিযান ২০০৭ Kewkradong.com images ২০০৫ সালের ডিসেম্বর মাস, কেওক্রাডং বাংলাদেশ এর সদস্যরা মিলে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম। বান্দরবান, বিরিশিরি, সেন্টমার্টিন ও আরো নানা স্থান ঘুরে কিভাবে যেনো সমুদ্র দেখার নেশায় পেয়ে বসেছিলো সবাইকে। তাই আমাদের সমুদ্র দেখার ইচ্ছাটাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত হলো পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত ভ্রমনে যাবো আমরা। আর যেহেতু এটা কেওক্রাডং বাংলাদেশের ট্যুর তাই অ্যাডভেঞ্চার না থাকলে কি চলে? তাই সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হলো আমাদের এই দীর্ঘ সমুদ্র ভ্রমণ হবে পায়ে হেটে। হেটে হেটে আমরা উপভোগ করবো পৃথিবীর দীর্ঘতম (১২০ কি.মি.) সমুদ্র সৈকত কে। দলে আমরা ছিলাম ৮ জন, এবং আমরা শুরুটা করেছিলাম টেকনাফ থেকে। আমাদের ওই তিনদিনের সৈকত ভ্রমণ শেষ হয়েছিলো মহেশখালীর ঝাউবনে পৌছে। সেই ভ্রমণে আমরা সবাই বিভিন্ন রুপে পেয়েছিলাম সমুদ্রকে, কখোনো চাঁদের আলোয় শাদা বালুকা বেলা আবার কখোনো মন খারাপ করা বাতাসে সমুদ্রের গর্জন। তবে যতই লোকালয়ের দিকে আসছিলাম সমুদ্র সৈকতের বেহাল অবস্থা দেখে আমাদের সবারই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, প্রকৃতি এতো উদারভাবে আমাদের তার সকল সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ দিচ্ছে আর আমরা মানুষরা তার কিভাবে অপব্যবহার করছি। বিশেষ করে যারা প্রতি বছর বিভিন্ন কারণে বেড়াতে যাচ্ছি এই সমুদ্র সৈকতে। আমরা বিভিন্নভাবে দূষিত করছি এই সমুদ্রের ইকোসিস্টেম কে। ঘটনা আর কিছুই না,আমরা এই সৌন্দর্য কে উপভোগ করতে গিয়ে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া বিভিন্ন পণ্যের মোড়ক, কাচের বা প্লাষ্টিকের বোতল, সিগারেটের ফিল্টার ফেলে আসছি ওই সৈকতে, যা দূষিত করছে সৈকতের পরিবেশ। এই বিশাল সমুদ্র সৈকত আমাদের গর্ব তাই এই সমুদ্র সৈকত পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বও আমাদের। তাই প্রিয় সমুদ্রের জন্য কিছু করার চিন্তাটারও শুরু হয়েছিলো তখন থেকেই। সদ্য জাপান থেকে মাউন্টেনিয়ারিং সেমিনার অংশগ্রহণ করে আসা মুনতাসির মামুন ইমরান ভাই জানালেন, আসলে পর্যটন স্থানের পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতন হতে হবে পর্যটকদেরই, প্রশাসন বা স্থানীয় লোকবল দিয়ে কিছুই করা যাবেনা। তিনি আরও জানালেন জাপানে গিয়ে তিনি এমন একটি সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কথা শুনে এসেছেন যা আমাদের দেশেও চাইলে করা যেতে পারে। গল্পটার শুরু হয়েছিলো এভাবেই........ গল্পটার বাস্তবায়ন সেইদিন থেকেই শুরু হয়েছিলো প্রিয় সমুদ্র সৈকতকে রক্ষা করার জন্য একটা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায় কিনা সেই চিন্তা ভাবনা। খোজ খবর করতে গিয়ে আমরা জানতে পেরেছিলাম, পৃথিবীব্যাপি সমুদ্র সৈকত পরিচ্ছন্ন করার জন্য একটি সংগঠন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দ্যা ওশেন কনজারভেন্সি নামক যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংগঠনের কার্যবিধির একটা বড় অংশ হলো ইন্টারন্যাশনাল কোষ্টাল ক্লিনআপ। এটি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পুরোনো স্বেচ্ছাসেবী কার্যকম। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যপার হলো পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের অধিকারী হয়েও আমাদের দেশে এরকম কোন কার্যক্রম চোখে পড়েনা। ১৯৮০ সাল থেকে এই কার্যক্রম চলে এলেও বাংলাদেশে কেউই তখন পর্যন্ত এরকম কোন সচেতনতামূলক কাজে অংশ নেয়নি। তাই আমরা ঠিক করলাম প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এরকম সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করার। সময়টা ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস। হঠাৎ মুনতাসির ভাইয়ের একটা মেইল পেলাম, যাতে লেখা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল কোস্টাল ক্লিনআপ আয়োজন করতে যাচ্ছি আমরা, এবং তা অবশ্যই ওশেন কনজারভেন্সির সহযোগিতায়। মেইলটা পেয়ে একটা শিহরণ অনুভব করেছিলাম শরীরে, মনে হয়েছিলো এমন একটা কিছুই তো খুজছিলাম এতোদিন। পৃথিবীব্যাপি এই স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম চলে এলেও বাংলাদেশে যেহেতু ধারণাটা নতুন। তাই এটাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আমাদের। “ময়লা কুড়াবো?”; “লোকে কি বলবে?”; “পুরান পাগলে ভাত পায়না, নতুন পাগলের আমদানি” আর অন্তহীন দন্তবিকশিত হাসি তো রয়েছেই। এতো মন্তব্যের পরও আমাদের থেমে থাকা হয়নি, এগিয়ে চলেছিলাম আমাদের আপন গতিতে। কোস্টাল ক্লিনআপ বাংলাদেশ’ ২০০৬ প্রথম বারের মতো সমুদ্র সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার জন্য ঢাকায় একটি মানব বন্ধনের আয়োজন করেছিলাম আমরা “সমুদ্র বাঁচাও” শিরোনামে, যাতে আমাদের সহযোগী হয়েছিলো অনেকগুলো সংগঠন, তারা হলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রিবৃন্দ; নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি আর্থ ক্লাব, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং ক্লাব; ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এনভাইরোমেন্টাল ক্লাব; প্রথম আলো বন্ধূসভা; সাদা (সামাজিক দায়বদ্ধতা); ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের নৃতত্ব বিভাগের ছাত্র-ছাত্রি বৃন্দ; বিটিইএফ এবং ধানমন্ডি গভঃ বয়েজ হাই স্কুলের ওল্ড স্কাউটস্ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যবৃন্দ। কোস্টাল ক্লিনআপ বাংলাদেশ ২০০৬ এর দ্বিতীয় অংশ ছিলো কক্্রবাজারে একটি সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা। জানি একদিনে খুব বেশী পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। তবুও ওইসব এলাকার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার একটা ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাই ছিলো এটা আমাদের। যাই হোক প্রবল বৃষ্টি মাথায় করে সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখে কক্্রবাজার রওয়ানা হলাম আমরা কেওক্রাডং বাংলাদেশের জনা পঁচিশেক সদস্য। যদিও তখনও জানিনা কি বিপদ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। কারণ, আমরা যে রাতে রওনা দেই কক্্রবাজারের উদ্দেশ্যে তার আগের দিন থেকেই নিুচাপের কারনে পুরো দেশে প্রবল বর্ষণ হচ্ছিলো। তো আমাদের প্রোগ্রাম কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ কাজ করছিলো। এর সাথে মরার উপর খাড়ার ঘায়ের মতো কক্্রবাজার বীচে ১০ নম্বর সিগন্যাল ছিলো। এরকম একটা অবস্থায় আমরা যখন পরের দিন সকালে কক্্রবাজারে নামলাম তখন সেখানে বৃষ্টি হচ্ছে। আমরা মাথা গোজার জন্য আমাদের কক্্রবাজারের শরণার্থি ত্রাণ ও প্রত্যবাসন কমিটির কার্যালয়ে (আর আর আর সি) আশ্রয় নিলাম। বেলা ১১টা নাগাদ বৃষ্টি একটু কমে এলে আমরা কাজে নামার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলো কক্্রবাজার জেলা স্কুলের প্রায় ৫০ জন ছাত্র। আমাদের এই সচেতনতা মূলক কার্যক্রমের শুভকামনা করে এর উদ্ভোধন করেন কক্্রবাজার জেলার এডিসি সাহেব। প্রায় ৩ ঘন্টাব্যাপি বীচ এলাকা পরিষ্কারের কাজ করলাম। আমাদের এই কাজের ফাকে ফাকে এলাকার মানুষকে এই কার্যক্রমের ব্যাপারে অবহিত করা হচ্ছিলো। এবং পর্যটকদের মধ্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য লিফলেট বিলি করা হচ্ছিলো। আমরা কাজ শেষে পেলাম প্রায ৫০ কেজি (!) পরিবেশের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর পদার্থ সমৃদ্ধ বস্তু এবং স্থানীয় মানুষের ভালোবাসা। এরপরে বৃষ্টি আবারো নামলে সেদিনের এই প্রোগ্রামের সমাপ্তি ঘোষনা করা হলো। আমরা আমাদের সংগৃহীত বস্তুগুলো ময়লা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে দিলাম। আমাদের লক্ষ্য ছিলো কম জায়গা নিয়ে বেশী সময় ধরে পরিষ্কার করা। এবং আমরা মোটামোটি সফল। কোস্টাল ক্লিনআপ বাংলাদেশ ২০০৭, নতুন শুরু গতবারের কাজ করার অভিজ্ঞতার আশির্বাদপুষ্ট হয়ে এবার আমাদের সামনে ডাক দিচ্ছিল আরো বড় করে স্বপ্ন দেখার, সেই লক্ষ্যেই আমরা এবারো ডাক দিয়েছিলাম সবাইকে আমাদের সাথে এক হয়ে একটা সুন্দর সমুদ্র সৈকতের স্বপ্নটার বাস্তবায়ন দেখার জন্য। এবং এবার আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলো প্রায় ৪০০ মানুষ। এদের মধ্যে ছিলেন ৮ বছরের সেদিনের শিশু থেকে ৮০ বছরের তরুনটি পর্যন্ত। এছাড়াও বাংলালিংক বাড়িয়ে দিয়েছিলো সহযোগিতার হাত। অংশ নিয়েছিলো ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের এনভাইরোমেন্টাল ডিপার্টমেন্ট; ইষ্ট-ওয়েষ্ট ইউনিভার্সিটি; ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮০ জন ছাত্র-ছাত্রি। ছিলো কক্্রবাজার স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোর প্রায় ২০০ জন ছাত্র ছাত্রি যাদের বয়স ৮ থেকে ১৫ বছর। এছাড়াও ছিলো ডেল্টা আউটডোরস, বিটিইএফ, দর্শন ক্লাব কক্্রবাজার, ধানমন্ডি গভঃ বয়েজ হাই স্কুলের ওল্ড স্কাউটস্ অ্যাসোসিয়েশন এবং জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প পরিবেশ অধিদপ্তর কক্্রবাজার। আর পুরো আয়োজনে নিঃস্বার্থভাবে মেডিকেল সহায়তা করেছে সেইফ বাংলাদেশ। উই ক্যান ডু ইট আমরাও পারি এটাই ছিলো এবারের আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য। আমরা বলতে চেয়েছিলাম, এই সমুদ্র সৈকত পরিচ্ছন্ন রাখতে পারি আমরাও। বলাই বাহুল্য আমাদের দলের বেশীরভাগ সদস্যই ছিলো বয়সে তরুণ, যারা স্বপ্ন দেখে আগামী দিনগুলোকে সুন্দর করতে। যদিও আমাদের এই আয়োজনও ভন্ডুল হতে বসেছিলো প্রকৃতির বিরুপ আচরণের কারণে। যখন সব কিছু ঠিকঠাক হঠাৎ আমাদের দেশে সুনামীর জন্য রেড এলার্ট জারী করা হয় এই আয়োজনের ঠিক আগের রাতে। কিন্তু একটা ভালো কাজের জন্য আমরা আবারো প্রকৃতির আশির্বাদ পেয়েছিলাম, হয়তো বিধাতাও সেদিন মুচকি হেসে ভেবেছিলেন তারুণ্যের জয় সবসময়ই হয়, তবে এবার নয় কেন। তাইতো দেশের রেড এলার্ট তুলে নেয়া হয় রাত সোয়া ২টা নাগাদ। ১৪ই সেপ্টেম্বর সকাল ১১ টা, একটি সুন্দর রৌদ্রালোকজ্জল দিন। কোথাও নেই বিপদজনক সংকেত নেই সুনামীর রেড এলার্ট। সব মিলিয়ে একটি চমৎকার দিন। সবাই মিলে মোটেল লাবণী থেকে একটি র্যালি করে পৌছালাম সমুদ্র সৈকতে। যেহেতু আমাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন যারা গতবার আমাদের সাথে কাজ করেছেন তাই খুব একটা বেগ পোহাতে হয়নি এবার। ডেভিড বারিকদারের ফ্রেমে সময়গুলোকে বন্দি করে তড়িঘড়ি কাজে নেমে পড়লাম আমরা। আমরা কাজ করলাম প্রায় সাড়ে ৪ ঘন্টার মতো, এবং কাজ শেষে পেলাম প্রায় ২৪০ কেজির মতো বর্জ্য। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো, সিগারেটের ফিল্টার; পলিথিন ব্যাগ; কোমল পানীয়র ক্যান এবং প্রচুর পরিমাণে প্লাষ্টিকের প্লেট ও কফির কাপ। গল্পটা স্বপ্ন হোক। শুরুটা হয়েছিলো ৮ জনের মধ্য দিয়ে, আজ আমাদের স্বপ্নটা ছড়িয়ে পড়েছে আরো ৪০০ প্রাণে। সুন্দর একটা সমুদ্র সৈকতের স্বপ্নটা কে খুব বেশী দুরের মনে হচ্ছে না এখন আর। যদি আমরা আরেকটু সচেতন হই। যদি আমরা অন্তত আমাদের সমুদ্র সৈকতের ময়লাগুলো নির্দিষ্ট স্থানে ফেলি তবে আমার মনে হয় সেই দিন খুব বেশী দুরে নয় যেদিন কল্পনায় নয় বাস্তবেই আমরা এই সৈকত দেখতে পাবো। আসুন আজ থেকে আমরা সমুদ্র সৈকত পরিষ্কার রাখি। অন্তত সেইসব ময়লা না ফেলি যা ক্ষতিকর। আমাদের সৈকত বাচাতে হবে আমাদেরই। খুব কি কঠিন স্বপ্নটাকে বাস্তবে রুপ দেয়া? আমন্ত্রন রইলো সৈকত পরিচ্ছন্নতা অভিযানে.... আপনাকে পাশে পাবো তো?একটা সুন্দর সমুদ্র সৈকতের জন্য মন্তব্যগুলো (1)
![]() লিখেছেন মো: নবীরুল ইসলাম - নবীন, June 03, 2008 মন্তব্য লিখুন
|
|
| সর্বশেষ আপডেট ( Monday, 31 December 2007 ) |
| পরে > |
|---|
মো: নবীরুল ইসলাম - নবীন
সুত্রাপুর, বগুড়া।
বাংলাদেশ