| প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে শিক্ষা সফর |
|
|
| লিখেছেন সীমান্ত দীপু | |
| Monday, 09 April 2007 | |
|
শুরুর কথা ![]() শিক্ষা সফরে আমরা সবাই বায়োজিদ বোস্তামির মাজার, কেউ ফিরেনা খালি হাতে ভোর ৪.৩০ মিনিটে আমাদের বাসটি ক্যাম্পাস ছাড়ার কারনে খুব তাড়াতাড়িই চট্টগ্রামের বায়োজিদ বোস্তামির মাজারে পৌঁছলাম। শত বছরের মুসলিম ঐতিহ্যের এ মাজারটিতে আমাদের যাবার মূল লক্ষ্যই হল বোস্তামী টারটেলগুলোর খবর নেয়া। সব মানুষই এখানে কোন না কোন উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছেন। কেউ মানত করতে আবার কেউবা মানত সুজতে এসেছেন। বোস্তামী (আঃ) এর মাজারের সামান্য দূরেই আছে বার আউলিয়ার মাজার। অনেকে এখানে এসেছে তাদের কবর জিয়ারত করতে। আছে আশালতা বা সুতা গাছ। যেকোন আশা করে এ গাছে সুতা বেঁধে দিলেই তার আশা নাকি পূরণ হয়। অনেকেরই ধারনা বায়োজিদ বোস্তামী বিদেহী আত্নাকে অলৌকিক ভাবে টারটেলে পরিণত করা হয়েছে। আসলে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অন্য কথা বলে। বোস্তমী (আঃ) এর সময়ে থেকে টারটেলগুলো এখানে ছিল। তখন থেকেই এরা মানুষের দেয়া খাবার খায়। ফলে এদের ফিডিং বিহ্যাবিয়র ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অটোমেটিক পরিবর্তন চলে এসেছে। যার কারনে এখানেই শুধু এদের পাওয়া যায়। ঠিক এমনটিই দেখলাম। প্রায় সব পূর্ণাথীই এ টারটেলগুলোকে কলিজা, ফুসফুস,বাদাম, ব্রেডসহ অনেক কিছু খাওয়াচ্ছে। সবারই ধারনা এতেই তাদের বাসনা পূরণ হবে। সকালের হিমছড়ি ও পবিত্র রাখাইন টেম্পল চট্টগ্রাম থেকে চুনাতি ও ফাইশাখালি হয়ে কক্সবাজার পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যাই হয়ে গেল। রাতের গ্রুপ ডিসকাশন তাড়াতাড়ি সারা হল। খুব ভোরেই চললাম রামুতে। এখানেই অবস্থিত বিখ্যাত রাখাইন বুদ্ধিষ্ট টেম্পল। ১৮৮৫ সালে একজন রাখাইন এটি প্রতিষ্টিত করেন। কাঠের তৈরী দোতলা এ মন্দিরটির কারুশিল্প দেখলেই মুগ্ধ হতে হয়। এখানে পিতলের তৈরী বেশকিছু অপূর্ব বৌদ্ধমূর্তি আছে।২টি স্বর্ণ মূর্তিও ছিল যা গত দু'মাস আগে চুরি হয়ে গেছে। সব মূর্তিগুলোই আনা হয়েছে বার্মা থেকে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান কথাই হল নির্বাণ লাভ। বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা এ টেম্পলে সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পূজা করে। এখানে দু'জন ভিক্ষু আছে। অবাক করা এদের জীবন। এরা কখনও সংসার করতে পারেনা। নিজেরা রান্না করে খেতে পারেনা। এদের পোশাকের নাম হল চিবর যা তাদের নিজেদেরই বুনাতে হয়। হয়ত এ কারনেই এরা এত শৈল্পিক। পোশাক শিল্পে তারা একেবারেই সাবলম্বী। এখান থেকে সোজাসুজি আমরা চলে আসি হিমছড়িতে। সকালের হিমছড়ি যেন কুয়াশায় মোড়ানো ছিল। আমরাই প্রথমে গিয়ে হিমছড়িরর হিলের দরজা খুলে ২৪৩টি সিঁড়ি বেয়ে একদম চূড়ায় উঠি। এখানে এসেই মনে হল পৃথিবীটা কত শান্ত, প্রকৃতিটা কত সুন্দর। নির্মল আকাশ ও পাহাড়টা কত কাছাকাছি। এখান থেকে সাগরের শান্ত মেজাজটা উপলদ্ধি করলাম। সে এক অন্যরকম পাওয়া। মনে হল সাগরের গভীরতা একেবারেই কম। পাহাড়ই সুন্দর। তারপর চললাম সি-বিচে। শুরু হল আমাদের কালেকশনের কাজ। এবারে পাওয়া গেল ষ্টার ফিস, জেলী ফিস,সপ্রিং রে, হার্মিটক্র্যাব সহ অনেক কিছু। মরুময় সোনাদিয়া ও ঐতিহাসিক আদিনাত মন্দির পরের দিন খুব সকালে আমরা গেলাম কক্সবাজারের ফিস ল্যান্ডিং জোনে। জীবনের গতি চলে গাড়ির চাকার মত। এখানে এসেই তা বোঝা গেল। মাছ দেখা ও কালেকশনের আগ্রহ নিয়েই এখানে আসা। যারা সমুদ্র উপকূলীয় নয় তারা এখানে গিয়ে চিনতে পারেন মাছগুলো। সুরমা, কোরাল, রিটা, টেকচাঁদা, রুপচাঁদা আরও কত কি! পুরো সমুদ্রিক মাছের ভান্ডারই এটা বলা যায়। বেলা বাড়তে থাকল। সবাই ট্রলারে চেপে বসলাম, উদ্দেশ্য সোনাদিয়া হয়ে মহেশখালি। বাকখালি নদী হয়ে আমরা চলছি। রোদের উত্তাপ বেড়ে চলল। একসময় সমুদ্রের মোহনার সৌন্দর্য আমরা উপভোগ করলাম। গাংচিলগুলো আমাদের পিছু নিতে লাগল। এরই মধ্যে মহ্সি অসুস্থ হয়ে পড়ল। চলছে মেডিকেল টিমের কাজ। আমরা পেয়ে গেলাম মরুময় সোনাদিয়া। বের হলাম পূর্বপাড়া ঘুরে দেখতে। চারদিকে বালি আর বালি। তাই এটাকে অনেকেই মরুময় বলেছে। তবে আমার কাছে দ্বীপটি জীবন্ত মনে হয়েছে। কতগুলো পরিবারের, কতগুলো হাড়িপেটে মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল আজকের এই সোনাদিয় দ্বীপটি। চারদিকে চলছে শুটকি প্রসেসিং এর কাজ। অনেক তথ্যই কালেক্ট করলাম। যথারীতি যাত্রা শুরু হল। মহেশখালি পৌঁছার আগেই কিছু কেওড়া গাছ আমাদের স্বাগত জানাল। এরপর উঠলাম পাহাড়ের চূড়ার আদিনাত মন্দিরটিতে। শ্রী শ্রী আদিনাত মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হিন্দু সমপ্রদায়ের দেবতা দেবাদিদেব মহাদেবের নামানুসারে। বাংলাদেশের দক্ষিণপ্রান্তের কক্সবাজার জেলার মহেশখালির বঙ্গপোসাগার ঘেষা মৈনাক পর্বতের সবচেয়ে উঁচু চূড়ায় মনোরম পরিবেশে আদিনাত শিব, তীর্থ মন্দিরটির অবস্থান। আদিনাতের অপর নাম মহেশ। এই মহেশের নামানুসারে মহেশখালি। এখানে ঢুকতেই প্রফেসর ফিরোজ স্যার বললেন দ'ুটি স্পেশাল জিনিস এখানে আছে তোমরা খুঁজে বের কর। অনেক খোঁজার পর পেলাম কাঙ্খিত সেই উত্তরটি। এর একটি হল- এখানে বহু আগে থেকেই একটি হনুমান আছে। অন্যটি হল- সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে প্রায় ১৮৫ফুটের মত উঁচু পাহাড়ে দুটি মিঠা পানির পুকুর।এরপর মহেশখালি গ্রাম ঘুরে দেখলাম লবন চাষ। সবশেষে পানের বরজ। সূর্য্যাস্তের মূহুর্তগুলো কক্সবাজার ছাড়ার ঘন্টা বেজে গেছে। শ্রদ্ধ্যেয় স্যার কামরুজ্জামান মনির বললেন আজই সি-বিচে তোমাদের শেষ গোসল। গোসলের মূহুর্তগুলো এক অন্যরকম অনুভূতি এনে দেয়। মনে হয় আমাদের দেশের পর্যটন নগরী এটা নয়, পর্যটন স্বর্গ। এখানে আসলেই মনে হবে পৃথিবীর সেরা বিচ হিসেবে কেন এটাকে পরিচয় করে দিতে হয়না। শেষ বিকেলের সূর্যটাকে ছাড়তে ইচ্ছা করে না। সূর্যটা সাগরের সাথে মিলে যায়। কাঙ্খিত বস্তুটি মূহুর্তেই চলে যায়, দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অনেকে, তারপর যথারীতি ঘরে ফিরে। ![]() অনন্য প্রকৃতি ন্যাটংহিলের সেই হাতিটি কামরুল হাসান স্যার ৮ম বার এ হিলে উঠছেন। একবার হাতির পালের তারাও খেয়েছেন। তাই আমাদের খুব সাবধানে এগোতে হবে। প্রায় ৪০জনের আমাদের এই টিমটি কোন সারা শব্দ না করে উঠছি তো উঠছি। উদ্দেশ্য যত কষ্টই হোক এবার আমরা হাতি দেখবই। বন্য হাতিকে শত শত ফিট উঁচু পাহাড়ে দেখার মজাই আলাদা। বহু ক্লান্তি, হতাশা শেষে আমাদের সামনে থেকে সিগন্যাল এলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে যাবার। তখন সকলেরই ভীতি কাজ করছে। আমাদের খুব কাছাকাছি একটি হাতি দেখা যাচ্ছে। কিছুটা পিছু হটলাম। তারপর সুবিধা জনক স্থান থেকে ফটোশেসন ও হাতি দেখা উপভোগ করলাম। টেকনাফের এই ন্যাটংহিলে আরও দেখলাম ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত বাঙ্কার। ট্যুর থেকে প্রাপ্ত এ আবিষ্কার গুলো আস্তে আস্তে আমাদের আবিষ্কারের নেশাকে আরও বাড়াতে লাগল। ছেড়া দ্বীপ টু সেন্টমার্টিন পর্যটন শিল্পের তীর্থস্থান,দেশী-বিদেশের পর্যটকদের আকাঙ্খিত দ্বীপ, বাংলাদেশের একমাত্র কোরাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য্য কাগজে কলমে যতটুকু লেখা যায় তার চেয়ে বেশি উপলব্ধি করা যায়। এখন আমরা সেখানেই আছি। বাংলো থেকে বেড়িয়েই চললাম কালেকশনের খোঁজে, সব ধরনের কোরাল এখানে দেখলাম। প্রচন্ড রোদের তান্ডবে প্রফেসর জব্বার হাওলাদার স্যার বললেন- এ নারিকেল জিনজিরায় কি করা যায় বলতো? পাশেই ছিল ডঃ হূমায়ন আহমেদের সমুদ্র বিলাস। কথা না বাড়িয়ে শুরু হল ডাব উৎসব। এরপর পড়ন্ত বিকেলে আমরা ট্রলারে চড়ে চললাম ছেড়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে। তারপর শুরু হল আমাদের ট্যুরের সবচেয়ে এ্যাডভেনঞ্জারের মূহুর্তটুকু। একটা জিদের বসেই সবাই মিলে হাঁটতে শুরু করলাম। ছেড়া দ্বীপ থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে। অবাস্তব কল্পনাকেও আমরা হার মানালাম। যারা পারছেনা তারা একজন আর একজনের ব্যাগ ধরে হাঁটছে। প্রতিটি সময়ই ছিল নতুন কিছু আবিস্কারের নেশা। দু'পাশ দিয়ে জনবসতিকে কেয়া গাছ দিয়ে ঘিরে রেখেছে। আর তার দুপাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সমুদ্র সৈকত। পথেই দেখলাম পরিবেশ মন্ত্রনালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত টারটেল হ্যাচারী। ১৫০কেজি ওজনের টারটেলের বাচ্চাগুলো এত ছোট হতে পারে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। শামুক ও ঝিনুক দিয়ে সি-বিচে গালিচা বিছানো রাস্তা, সাথে সাথে সূর্যাস্ত সব কষ্টকে ম্লান করে দিল।এই অনুভূতিগুলোকে ধরে রাখা যায় শেয়ার করা যায় না। রাতের সেন্টমার্টিন আরও সুন্দর। সমুদ্রের গর্জন আর সাথে সাথে ফসফরাসের আভা মনে হয় ঢেউয়ের সাথে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। আকাশে চাঁদ ছিল না তাই সমুদ্রের সাথে আমরা ভালই মানিয়ে গিয়েছিলাম। ডুলাহাজরা সাফারী পার্ক,হতেপারে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মিলনমেলা চকরিয়া সুন্দরবনের খানিকটা অংশ দেখে সরাসরি আমরা চলে গেলাম সাফারী পার্কে।রাতের ডিসকাশনে সাফারী পার্ক নিয়ে সকলেই হতাশা ব্যক্ত করল।বলল-যে উদ্দেশ্য নিয়ে সাফারী পার্ক বানানো হয়েছে তা প্রতিফলিত হয়নি।এটা আসলে একটা চিড়িয়াখানা হয়ে গেছে।সাফারী পার্ক বাংলাদেশের এমনকি গোটা বিশ্বের একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে যদি এর প্ল্যানিংটা ঠিকভাবে করা যায়।আর এর জন্য প্রয়োজন প্রত্যেকেরই সচেতনতা বৃদ্ধি।তাহলেই এ পার্কটিতেই গড়ে উঠতে পারে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মিলনমেলা। সুপ্তধারা ঝরণা, ইকোপার্ক সীতাকুন্ডের ইকোপার্ক, টোটাল ইকোসিস্টেমের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সারি সারি গাছ, পাহাড় আর ঝরণা দেখতে ইকোপার্কের তুলনা হয় না। সুপ্তধারা ঝরণা কথাটা যতনা সহজ এটা দেখা তার চেয়ে বহুগুনে কঠিন। আমরা যতগুলো পাহাড় দেখলাম তার মধ্যে সবচেয়ে খাড়া পাহাড় দিয়ে নামতে হল। গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছুটছে অনুসন্ধানী দল, সবশেষে সুপ্ত ধারা ঝরণা।ন্যাচারাল ড্রিংকিং ওয়াটার এখানেই সম্ভব তাই সবাই কম বেশী খেল। ১৮বছরের সাফল্য ১৮বছরের কথা নিয়ে আলাপ করতে গিয়েই প্রফেসর ফিরোজ বললেন- প্রথম বছর আমরা ময়মনসিংহ থেকে এ যাত্রা শুরু করেছিলাম। এখনও প্রতি বছরই সফল ভাবে একটা করে ট্যুর সম্পন্ন হয়। ১৮বছরের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা বহু ট্যুর দিয়েছে। ট্যুর থেকে যে শিক্ষা তারা পায় তা জীবনের গতিটায় পাল্টে দেয়। আর তাদের কালেকশন থেকেই প্রাণিবিদ্যা বিভাগে এখন ওয়াইল্ডলাইফ, ফিশারিজ ও এ্যান্টোমোলজি নামক তিনটি সমৃদ্ধ ল্যাব হয়েছে। ডিপার্টমেন্টে ঝুলছে বহু ডিসপ্লে বোর্ড। প্রতি বছর ট্যুর শেষ হয়ে গেলেই সবকাজ শেষ হয়ে যায় না। ট্যুর নিয়ে চলে সেমিনার, এক্সিবিশন। এর সম্ভবনা নিয়ে আলোচনাও হয়, হয় সমালোচনা। আর এখান থেকেই বেড়িয়ে আসে এক একটি ভাল সিদ্ধান্ত যা প্রকৃতি, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় খুবই জরুরী। এ ট্যুরের শিক্ষাই যেন আগামী প্রজন্মের জন্য আরও সুখকর হয় এ কামনায় করি।
স্প্যামবটের হাত থেকে এই ইমেল ঠিকানা সুরক্ষিত আছে। পড়ার জন্যে জাভাস্ক্রিপ্ট অন করুন।
মন্তব্যগুলো (2)
![]() লিখেছেন Baitul Islam, March 06, 2008
Very interesting
মন্তব্য লিখুন
|
|
| সর্বশেষ আপডেট ( Tuesday, 29 May 2007 ) |
| < পূর্বে | পরে > |
|---|